আস্থাহীনতায় যুক্তরাষ্ট্র: নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে গালফ
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় (গালফ) আরব দেশগুলো ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের পর শক্তিশালী হয়ে ওঠা তেহরানের মোকাবিলা করতে নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।
বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত নিয়ে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তামূলক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উৎকণ্ঠায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে ইরানের হামলায় সবচেয়ে বেশিগ্রস্ত হয়েছে এই দেশগুলো।
জিসিসি সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রধান অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র, যারা এবার ইরানের হামলা থেকে তাদের রক্ষা করতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধের দুর্যোগের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই দেখতে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত ছিল তার ঘাঁটি রক্ষায়; সেটিও তারা ঠিকমতো কুলিয়ে উঠতে পারেনি। বহু পক্ষের সঙ্গে লড়াই করেও টিকে রয়েছে ইরান। আর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে গাফল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধস নামিয়ে দিয়েছে তেহরান। এই অবস্থায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায় না তারা।
গালফ দেশগুলোকে ইরানের সরকার ও তাদের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের হুমকির সঙ্গে বসবাস করতেই হবে। তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের পাল্টা হামলার সময় সেগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। আবার গালফ দেশগুলো বেসামরিক স্থাপনা, তেলক্ষেত্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে দেশগুলো বলছে, তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না যে, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে। এই নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে গালফ দেশগুলোকে ইরানকে সহ্য করে চলতে হবে।
যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার সময় ইরান জোর দিয়ে বলেছে, যুদ্ধ চলাকালে যে নিয়ন্ত্রণ তারা ওই হরমুজ প্রণালিতে প্রতিষ্ঠা করেছে, তা তারা বজায় রাখবে।
এটি বজায় থাকলে তেহরানকে ইচ্ছামতো গালফ অঞ্চলের ওপর চাপ প্রয়োগের সুযোগ দেবে। এই প্রণালির ভবিষ্যৎই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হবে।
গালফ দেশগুলো দাবি করেছে, পাঁচ সপ্তাহের এই সংঘাতে তারা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বেশিরভাগই সফলভাবে প্রতিহত করেছে, যা তাদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা দেখায়।
তবে ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনকে কেন্দ্র করে একটি কঠোর অবস্থানের গোষ্ঠী রয়েছে, অন্যদিকে কিছু দেশ আবার তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তির পথ খুঁজছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বুধবার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাবান দ্বীপে তাদের তেল স্থাপনায় হামলার পেছনে সম্ভবত সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল এবং ইরান পাল্টা আঘাত করেছে। এটি হলে সংঘাতে কোনো গালফ দেশের একমাত্র আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হবে। এ বিষয়ে আমিরাত কোনো মন্তব্য করেনি।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরব ও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফোনে কথা বলে “উত্তেজনা কমিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের উপায়” নিয়ে আলোচনা করেন।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাদার মুসা আল-সাইফ বলেছেন, গালফ দেশগুলোর উচিত তাদের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে ভাবা। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে তুরস্কসহ অন্যান্য মধ্যম শক্তির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। তিনি বলেন, অঞ্চলটিকে বারবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে বের করে এনে অর্থনৈতিক ভিত্তি নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, “গালফ অঞ্চলের সব দেশেরই উচিত নতুনভাবে চিন্তা করা। প্রশ্ন হলো, কীভাবে পুরো অঞ্চলকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়।”
তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো বড় ও সক্ষম সামরিক শক্তির দেশগুলো গালফে আরো বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধের আগেও এই দিকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়েছে। এই সংঘাতের সময় সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার দ্রুত ইউক্রেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যাতে ইরানি ড্রোনের হুমকা মোকাবিলা করা যায়।
‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠনের কথাও উঠেছে। তবে সেটি বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করা হয়। মার্চে সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তান নিয়ে ‘স্টেপ’ নামে একটি নতুন জোট গড়ে ওঠে। তবে এসব দেশের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তারা ইরান না কি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে; এই অস্পষ্টতা জোটটিকে জটিল করে তুলেছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের ইরানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে, তাই তারা তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না।
যুক্তরাজ্য, যারা যুদ্ধের সময় গালফ অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষায় সাহায্য করেছিল, তারাও ভূমিকা রাখতে পারে। বুধবার জেদ্দায় এসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সৌদি যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়িয়ে সক্ষমতা ও পারস্পরিক নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি আলোচনা করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরো গভীর হবে এবং অন্যান্য দেশও আমিরাতের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। যার মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতাও রয়েছে।
আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের হামলায়। দেশটির ওপর ২ হাজার ২৫৬টি ড্রোন ও ৫৬৩টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যার ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রতিহত করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেই জায়গায় ইসরায়েলের ওপর ইরান প্রায় ৮৫০টি প্রক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
আবদুল্লাহ বলেন, “গত ৪০ দিনে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য আরব দেশের কাছে এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এমন শত্রুর মুখে আপনাকে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন সতর্ক থাকতে হবে।”
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গালফ প্রকল্প পরিচালক ইয়াসমিন ফারুক বলেন, “সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। লোহিত সাগরের তীরবর্তী পাইপলাইন ও বন্দর, বড় ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং কম ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো এ ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করবে। তবে পুনর্গঠনের খরচ রিয়াদের ২০৩০ সালের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।”
তিনি বলেন, “সৌদি আরবের কৌশলগত গভীরতা ও পুনরুদ্ধারের সম্পদ রয়েছে। তাদের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের অনেক সাহায্য করেছে।”
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, গালফ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিতে চায় না, বরং ইউরোপসহ অন্যদের সঙ্গে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বাড়াবে। তিনি মনে করেন, তারা আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, বন্দর ও লবণাক্ত পানি শোধনাগারের সুরক্ষা, সামুদ্রিক নজরদারি এবং বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরিতে আরো বিনিয়োগ করবে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখনো গালফে একমাত্র শক্তি যার বাস্তব সামরিক কাঠামো রয়েছে। তবে অনেক গালফ নেতার কাছে এখন এটি অনির্ভরযোগ্য ও ব্যয়বহুল নিরাপত্তা অংশীদার বলে মনে হচ্ছে; যেখানে গালফ দেশগুলো বড় মূল্য দেয়। তবুও পাল্টা হামলার ঝুঁকি বহন করতে হয়। ঘাঁটিগুলো থাকবে কিন্তু এখন সেগুলো ঢাল নয়, বরং যেন বিপদের সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
[লেখক: ইসলামাবাদভিত্তিক দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক সাইদ খান। তার এই লেখাটি ১০ এপ্রিল প্রকাশ হয়েছে।]
ঢাকা/রাসেল
কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়াদের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত