শীর্ষনেতাদের পদত্যাগে টালমাটাল এনসিপি, দলছুটদের গন্তব্য কোথায়
রায়হান হোসেন || রাইজিংবিডি.কম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন গভীর সংকটে। একের পর এক শীর্ষ নেতার পদত্যাগে দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত তৈরি হয়েছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্ত ঘিরে আদর্শিক বিভাজন প্রকাশ্যে আসায় এনসিপির ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দলের পদত্যাগী নেতাদের বড় একটি অংশের দাবি, যে উদারপন্থি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মধ্যপন্থির নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তারা এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া সেই আদর্শের পরিপন্থি। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সঙ্গে সখ্যতাকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা মেনে নিতে পারছেন না অনেক হেভিওয়েট নেতা। একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতাদের এই পদত্যাগে দলটিকে বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন নেতৃত্বশূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক মহলে এখন বড় কৌতূহল হলো পদত্যাগী এই প্রভাবশালী নেতাদের গন্তব্য আসলে কোথায়। তারা কি বড় কোনো রাজনৈতিক দলে ভিড়ছেন, নাকি অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন কোনো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরির পথে হাঁটছেন।
শীর্ষ নেতাদের হারিয়ে কোণঠাসা এনসিপি
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এনসিপি রাজনৈতিক মহলে যে বড় ধরনের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যাত্রা শুরুর এক বছরের মাথায় সেই দলটিই এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ। যে শীর্ষ নেতাদের হাত ধরে দলটির সাংগঠনিক ভিত মজবুত হয়েছিল এবং যারা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের একযোগে পদত্যাগে দলটিকে নেতৃত্বহীনতা ও সাংগঠনিক শূন্যতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আদর্শিক যে ফাটল ধরেছে, তা দলটিকে এখন রাজনৈতিকভাবে একা ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিভ্রান্তি। অনেক কর্মী মনে করছেন, যে উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলে তারা এনসিপিতে আসছেন, বর্তমান নেতৃত্ব সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতাদের পদত্যাগ কেবল এনসিপির অভ্যন্তরে টালমাটাল অবস্থা সৃষ্টি করেনি, বরং সাধারণ মানুষের মাঝে দলটির যে নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তাতেও বড় ধরনের চির ধরিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে এনসিপির যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় গত ২৮ ডিসেম্বর। এর আগের দিন সন্ধ্যায় জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হওয়ার অনুরোধ করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে স্মারকলিপি দেন ৩০ নেতা। ঐদিন সন্ধ্যায় এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন এনসিপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা।
এছাড়া, পদত্যাগকারী এনসিপির উল্লেখযোগ্য অন্যান্য নেতারা হলেন: দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য আসিফ নেহাল (আসিফ মোস্তফা জামাল), মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল-আমিন টুটুল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, "আমাদের দল প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে যারা অবদান রেখেছেন, দলের জন্য কষ্ট করেছেন, কাজ করেছেন এবং এরকম কয়েকজন নেতা অভিমান করেছেন এবং তারা দলত্যাগ করেছেন অনেকে আবার ফিরেও আসতেছেন। রাগ ভাঙছে, অনেকে যোগাযোগ করছেন ফিরে আসার জন্য।"
নেতাদের পদত্যাগ এনসিপিতে কোনো প্রভাব পড়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “না তেমন কোন প্রভাব পড়েছে বলে আমার কাছে মনে হয় নাই। কারণ দলের এখানো পাঁচ জন এখানে আছেন, যাদেরকে সুপারভাইট বলতে পারেন আপনি। তারাই তো মূলত আসলে এনসিপি লিড করে। তারা ছাড়া বাকি যারা মানে দুই একজন অভিমান করছে তাদেরও তো অবদান ছিল। দলের একদম ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সভাপতি পর্যন্ত মিলেই তো একটা দল। আমরা তো কাউকে ছোট করছি না। একদম খুব বড় প্রভাব পড়েছে এরকম কিছু তো আমরা দেখি নাই।”
এনসিপি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেল সম্পাদক থেকে পদত্যাগ করেছেন মুশফিক উস সালেহীন। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, “এই মুহূর্তে আমার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যাওয়ার চিন্তা নেই। তবে আমি পর্যবেক্ষণ করছি। ভবিষ্যতে যদি কোন সিদ্ধান্ত নেই তাহলে আপনাদের জানাবো।”
আদর্শিক সংঘাত নাকি নেতৃত্বের লড়াই
জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে যে তরুণ নেতৃত্ব একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ স্বপ্ন দেখিয়ে দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল, আজ সেই প্ল্যাটফর্মে থেকেই প্রথম থেকে থাকা কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে পদত্যাগ করছেন। গত কয়েক সপ্তাহে দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যে গণপদত্যাগের হিড়িক পড়েছে, তা রাজনৈতিক মহলে এক বড় প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছেন, এর অন্যতম কারণ হলো আদর্শিক বিচ্যুতি।
এনসিপি'র সূত্র বলছে, এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়ার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। পদত্যাগী নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, অভ্যুত্থানের যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও মধ্যপন্থি চেতনার ওপর ভিত্তি করে এই দল গঠিত হয়েছিল, একটি বিশেষ ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সেই দর্শনের মূলে আঘাত করেছে।
এনসিপির নেতাদের এই পদত্যাগের কারণ আদর্শিক সংঘাত নাকি নেতৃত্বের লড়াই এই প্রশ্নের উত্তরে দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, "আমি মনে করি তাদের মনে এটা অভিমান ও বোঝাপড়ার ঘাটতি। আমরা এগারো দলের সঙ্গে একটা সমঝোতা করেছি। এই সমঝোতা হয়েছে জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখা এবং জুলাই সংস্কারগুলোকে কার্যকর করার কৌশল হিসেবে।"
তিনি আরো বলেন, “পাওয়া না পাওয়ার অনেক গল্প থাকে। হতাশা থাকে। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকে। আবেগ থাকে। একটা দল করলে তো এখানে পাওয়া না পাওয়ার অনেক গল্প থাকবে। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই। নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় কেউ ভালো করে। কেউ একটু পরে গিয়ে ভালো করে। সুতরাং এটাকে আমরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি।"
এনসিপি থেকে পদত্যাগ আদর্শিক সংঘাত নাকি নেতৃত্বের লড়াই এ সম্পর্কে জানতে চাইলে দলটি থেকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করা নেতা খান মুহাম্মদ মুরসালীন রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, "এটা তো অবশ্যই আদর্শিক জায়গা থেকে। কারণ বাংলাদেশটা একটা কলোনিয়াল সিস্টেমের মধ্যেই আছে। একটা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পরেও আল্টিমেটলি আমরা সেই কলোনিয়াল সংবিধান কলোনিয়াল আইন এবং সিস্টেম থেকে বের হতে পারি নাই। ফলে আল্টিমেটলি দেখা গেছে যে এই দুই হাজার শহীদের বিনিময়ে রক্তের বিনিময়ে আমরা মূলত নতুন সংবিধান বা নিউ রিপাবলিক এই কথাগুলো বলতেছিলাম। কিন্তু এখন এনসিপি জামায়াতের সাথে জোটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তারা অফিশিয়ালি পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যেই তারা ঢুকে পড়েছে। তাই আপনি এটাকে আদর্শিক অমিলের জন্য বলতে পারেন।”
তৃণমূলের বিভ্রান্তি, আস্থার সংকটে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা
যেকোনো রাজনৈতিক দলের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তৃণমূলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও সমর্থকরা। জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে বুক পেতে দেওয়া যে তরুণরা একটি নতুন ধারার রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে এনসিপির পতাকাতলে জড়ো হয়েছিলেন, আজ তারা বিভ্রান্তি ও আস্থার সংকটে। কেন্দ্রের শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ এবং আদর্শিক বিচ্যুতিতে খেই হারিয়ে ফেলছেন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কর্মীরা। যে দলটিকে তারা মনে করেছিলেন প্রচলিত রাজনীতির বিকল্প, আজ সেই দলের ভেতরেই পুরনো কায়দায় ভাঙন দেখে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস।
এনসিপি'র সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ের সিংহভাগ কর্মীর কাছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির কথিত জোট বা সমঝোতার খবরটি ছিল বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো। যে বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তারা গ্রামেগঞ্জে এই দলের নাম ছড়িয়েছিলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের বর্তমান অবস্থান সেই আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন তারা।
অনেক জায়গায় কর্মীরা দলবদ্ধভাবে কার্যক্রম স্থগিত রাখছেন, আবার কেউ কেউ নীরবে প্রস্থান করছেন।
এনসিপির ঢাকা মহানগরীর নিউমার্কেট থানা যুগ্ম সমন্বয়কারী পদ মর্যাদার একজন নাম না প্রকাশ করার শর্তে রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “যারা পদত্যাগ করেছেন তারা দল প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু তারা যে স্বপ্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি এনসিপি গঠন করেছিলো, জামায়াতের সাথে জোটের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি আজ ধুলোয় মিশে গেছে। তৃণমূলের কর্মীরা আজ দিশেহারা। কোনো নির্দিষ্ট দলের চেয়ে দেশ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা বড়।”
দলত্যাগীদের পুরনো ঘরে ফেরা নাকি নতুন ঠিকানার খোঁজ
এনসিপি থেকে শীর্ষ নেতাদের গণপদত্যাগের পর এখন সবচাইতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, পদত্যাগকারী নেতাদের রাজনৈতিক গন্তব্য আসলে কোথায়?
জানা গেছে, পদত্যাগী নেতাদের একাংশ এরইমধ্যে তাদের পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন, যাদের অনেকেই আগে ছাত্রদল বা বামপন্থি ছাত্রসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের জন্য এটি অনেকটা ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা’র মতো। অন্যদিকে, একটি শক্তিশালী অংশ মনে করছে, পুরনো দলগুলোর ছায়াতলে না গিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা সম্পূর্ণ নতুন এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করতে পারেন।
এনসিপি'র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, “বিএনপির মেজর আখতারুজ্জামান জামায়াতে যোগদান করেছেন, আবার জামায়াতের কিছু লোকজন বিএনপিতে যোগদান করতেছে, এনসিপির একজন লোক বিএনপি যেতে পারে বা জামায়াতে যেতে পারে, অন্য যেকোনো দলে যেতে পারে রাজনীতি ছেড়েও দিতে পারে। অন্যান্য দলের লোকজনও এনসিপিতে আসতে পারে আসতেছে। এই অধিকার তার সাংবিধানিক অধিকার এবং এই অধিকার বাধা দেওয়ার অধিকার কারোই নেই। যদি কেউ বাধা দেয় তাহলে তার সংবিধানের অধিকারকে সে খর্ব করার চেষ্টা করছে এটা অন্যায় সুতরাং কেউ কোথাও যদি বেটার কিছু পায় সে যাইতেও পারে আচ্ছা। এটা তো গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। এটা তো সাংবিধানিক অধিকার।"
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করা নেতা খান মুহাম্মদ মুরসালীন রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, “আমরা তো এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছি কিন্তু রাজনীতি থেকে তো পদত্যাগ করি নাই। আমরা আমাদের রাজনৈতিক জায়গাটা জুলাইয়ের রাজনীতি বলতে আমি যেটা বোঝাচ্ছি যে স্কুলের যে ছেলেটা কিংবা কলেজের যে মেয়েটা বন্দুকের সামনে দাঁড়াইলো নিজের ভাইয়ের লাশ নিয়ে মিছিল করলো যে মায়েরা পানির বোতলটা আগায় দিল তারা তো রাজনীতিবিমুখ ছিল, তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে প্রবেশ করেছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে যে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এদেরকে একটি পোলারাইজড রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলা সেটা কোন আদলে কোন ফর্মে সেটা নিয়ে আমরা ভাবতেছি আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করতেছি।"
এনসিপির দলত্যাগীদের রাজনৈতিক অবসর নাকি ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতি
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এনসিপিতে পদত্যাগের হিড়িক রাজনীতিতে এক নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই পদত্যাগ কি কেবলই প্রতিবাদ, নাকি এর আড়ালে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী কোনো ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ (অপেক্ষা করো এবং দেখো) নীতি? বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনি জোট গঠনের সিদ্ধান্তের পর যারা নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন, তারা কি রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে অবসরে যাচ্ছেন, নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণের অপেক্ষায় সময় নিচ্ছেন তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এনসিপির সূত্র বলছে, পদত্যাগীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক পদত্যাগের পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক গন্তব্য স্পষ্ট করেছেন। অন্যদিকে, ডা. তাসনিম জারা সরাসরি কোনো দলে না ভিড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আবার অনেক ত্যাগী নেতা কোনো পক্ষেই না গিয়ে নীরবতা পালন করছেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে একটি পরিকল্পিত কৌশলী অবস্থান। তারা কি অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় কোনো ঢেউয়ের অপেক্ষায় আছেন, নাকি পর্দার আড়ালে নতুন কোনো ‘তৃতীয় শক্তি’র প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই রহস্যই এখন দেশের রাজনৈতিক মহলে সবচাইতে আলোচিত বিষয়।
নতুন কোন রাজনৈতিক দলের যোগদান করবেন কি জানতে চাইলে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করা নেতা খান মুহাম্মদ মুরসালীন রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, “এখন আপাতত কোন সম্ভাবনা নাই। শুনছি একটা নতুন প্লাটফর্ম আসতেছে, এটা একটা ইতিবাচক দিক যে তারাও জুলাইকে নিয়ে ভাবতেছে। তারা বুঝতে পারছেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো পূরণ হয় নাই। এটা যে তারা বুঝতে পারছেন এই আমি জন্য তাদেরকে আমি সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি আমার আহ্বান থাকবে যে তারা যাতে সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থীর থাকে। বাংলাদেশে আসলে নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হয় নাই। ফলে নতুন নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তো আমি তাদেরকে শুভকামনা জানাই এবং আমি আশা করি যে তারা এই দিকগুলো নিয়ে কাজ করবে।"
মাহফুজ আলমের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ইঙ্গিত
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নতুন ধারার রাজনৈতিক দল গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ বিষয়ে আগ্রহীদের তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাত ১২টার দিকে ফেসবুক পোস্টে তিনি এ ইঙ্গিত দেন।
পোস্টে তিনি লিখেন, “আরেকবার চেষ্টা করে দেখি, নতুনভাবে কিছু করার কথা বলার পর গত দুই সপ্তাহে কয়েকশ' ছাত্র ও নাগরিকদের সাথে কথা হয়েছে, যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ব্যপারে একসময় আশাবাদী ছিলেন। যাদের সাথেই কথা হয়েছে তাঁদের মধ্যে একধরণের হতাশা ও আস্থাহীনতা দেখেছি। কিন্তু, কথা শেষে আমরা এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে, আমরা সবাই আরেকবার চেষ্টা করে দেখতে চাই।”
মাহফুজ আলম লেখেন, “আপনারা যারা বৈষম্যহীন ব্যবস্থা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও নূতন আর্থ-রাজনৈতিক বন্দোবস্তে বিশ্বাসী, দ্বি-দলীয় (এবারে জোট) কাঠামো নিয়ে অনাগ্রহী, তদুপরি আদর্শিকভাবে আপোসহীন এবং পলিসি-বেইজড রাজনীতি প্রত্যাশা করেন, তারা আশা করি যোগাযোগ করবেন।”
সাবেক এই তথ্য উপদেষ্টা লিখেন, “আমরা আপনাদের ক্ষোভ, হতাশা, অপ্রাপ্তি যেমন শুনতে চাই, তেমনি আমাদের দিক থেকে হওয়া ব্যক্তিগত ও সামষ্ঠিক ভুল, বাস্তব সঙ্কট ও কমতিগুলো নিয়েও কথা বলতে চাই। গত দেড় বছরের পর্যালোচনা শেষে আমরা কীভাবে নতুন করে শুরু করতে পারি, সে সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।"
তার এই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ইঙ্গিত অনেকে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলাতে চাযন। এনসিপির একটি সূত্র বলছে, মাহফুজ আলম যদি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন, তাহলে পদত্যাগ করা অনেকে তার সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।
এনসিপি থেকে কয়েকজন পদত্যাগী ও বামপন্থি রাজনীতিবিদ নিয়ে আসছে নতুন প্ল্যাটফর্ম
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা কয়েকজন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় বামপন্থি রাজনীতিবিদদের নিয়ে আসছে নতুন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। আগামী শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) প্ল্যাটফর্মটির আত্মপ্রকাশের কথা রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির নাম জনযাত্রা (পিপলস মার্চ) হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্লাটফর্মটির অন্যতম উদ্যেক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর হুযাইফা আল মামদূহ গণমাধ্যমকে বলেন, “এনসিপি থেকে বের হয়ে এই প্লাটফর্ম তৈরি হচ্ছে না। বরং এই প্লাটফর্ম তৈরির জন্য বহু আগে থেকেই আলাপ-আলোচনা চলমান ছিল। আবার এনসিপির সাবেক কয়েকজনও থাকবেন এই প্লাটফর্মে। তবে এনসিপি থেকে বের হয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ব্যাপারটি সেরকম না। এনসিপির সাবেক নেতা অনিক রায় ও তুহিন খান এই প্লাটফর্মের সঙ্গে থাকবেন। এছাড়া, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের (একাংশ) সহ-সভাপতি নাজিফা জান্নাত এবং ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মেঘমল্লার বসুও থাকছেন এই উদ্যোগের সাথে।”
এনসিপি'র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় গণমাধ্যমকে বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অনেকেই আমাদের প্লাটফর্মে থাকবেন।”
এনসিপির থেকে পদত্যাগ করা কয়েকজন নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্মে যোগ দেওয়ার সম্পর্কে জানতে চাইলে দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির রাইজিংবিডি ডটকমককে বলেন, “তাদের জন্য আমাদের শুভকামনা। আমরা বাংলাদেশে একটি বামপন্থি ভালো দল গড়ে উঠুক। এখানে বামপন্থি রাজনীতির একটা শূন্যতা বিরাজ করছে, স্মার্ট লিডারশিপ পাওয়া যাচ্ছে না। যদি একটা বামপন্থি ভালো দল গড়ে উঠে দেশকে সেবা করতে পারে দেশ গঠনের কাজে সহযোগিতা করতে পারে ডেমোক্রেসির জন্য কাজ করে আমরা তো সেটাকে খারাপ দেখি না। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা কাকে গ্রহণ করবে।”
এনসিপির শুরু থেকে যারা ছিলেন তাদের দল থেকে পদত্যাগের বিষয়টি জানত চাইলে সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, "যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের বিষয়টি আমাদের আহত করেছে। তারা পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তা এখনো অফিশিয়ালি গ্রহণ করিনি। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
ঢাকা/ইভা