চলছে আসন সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা
যেকোনো সময় ভাঙতে পারে ১১ দলীয় জোট
মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন || রাইজিংবিডি.কম
১১ দলীয় জোট। ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেওয়া
শেষ মুহূর্তে এসে আসন চূড়ান্ত করতে পারেনি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলীয় জোট। আসন বণ্টন নিয়ে জোটের বড় দুটি দল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যেই চলছে মূলত টানাপোড়েন। অসন্তোষ রয়েছে জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও মামুনুল হকের খেলাফত মজলিসের মধ্যেও।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দিনভর দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা হয়েছে। আসন সমঝোতার জন্য রাতেও দলগুলোর নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। আজ-কালের মধ্যে সমঝোতা না হলে যেকোনো সময় ভাঙতে পারে ১১ দলীয় এই জোট। বেরিয়ে যেতে পারে চরমোনাইপীরের ইসলামী আন্দোলন ও মাওলানা মামুনুল হকের খেলাফত মজলিস-এমনটাই জানিয়েছেন জোটের শরিকদলের নেতারা।
তবে জোট নিয়ে এখনো আশার কথা জানিয়েছেন জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, “দু-একদিনের মধ্যে ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়ে যাবে।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, “ইসলামী আন্দোলন এখনো জোট থেকে বের হয়ে যায়নি। আলোচনা চলছে। আশা করছি সন্তোষজনক সমাধান হবে।”
জোটের নেতারা জানায়, আক্বিদাগত বিরোধ দূরে সরিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একবক্স নীতিতে একসঙ্গে নির্বাচন, একসঙ্গে আন্দোলনে একজোট হয়েছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, চরমোনাইপীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, মামুনুল হকের খেলাফত মজলিসসহ ৮ দল। পরে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জোটেযুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), কর্নেল (অব.) অলির এলডিপি ও এবি পার্টি।
আসন সমঝোতা করে একসঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছিল ১১ দলীয় জোট। জোটের শরিক দলগুলো নিয়ে সমঝোতাভিত্তিক আসন ও প্রার্থী নির্ধারণে দফায় দফায় বৈঠকও হয়েছে। শীর্ষনেতারা মিলিত হয়েছেন বারবার। তিনশ আসনে প্রার্থী বাছাই, জোটের শরিক দলগুলোর কে কয়টা আসন পাবে এ নিয়ে নির্বাচনি প্রস্তুতিও বেশ এগিয়ে ছিল। ১১ দলীয় জোটের মধ্যে এনসিপি, এলডিপি, এবি পার্টিসহ অন্য ছোটদলগুলোর আসন অনেকটা চূড়ান্তও করা হয়।কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতায় আসতে পারেনি জোটের সবচাইতে বড় দুটি দল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন।তার মধ্যে মামুনুল হকের খেলাফত মজলিস ও এনসিপি কিছু আসন বাড়ানোর জন্য দর কষাকষি করছে। দল দুটিতেও অসন্তোষ রয়েছে।
এহেন পরিস্থিতিতে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ দলগুলোর নেতাদের সর্বশেষ আলাপ-আলোচনা এবং বৈঠকেও সমাধান হয়নি। ফলে, আসন চূড়ান্ত করাসহ জোটের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে বুধবারের (১৪ জানুয়ারি) ডাকা সংবাদ সম্মেলন হঠাৎ করে স্থগিত করে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের আমিরের অনুরোধে এই সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে বলে অজুহাত দেখানো হলেও এবিষয়টি সত্য নয় বলে বুধবার সন্ধ্যায় পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেকোনো সময় ১১ দলীয় জোটটি ভেঙে যেতে পারে। জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে ইসলামী আন্দোলন।এমনকি, মামুনুল হকের খেলাফতও জোট ছাড়তে পারে বলে জোটের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের শরিক দলের একজন শীর্ষপর্যায়ের নেতা বলেন, “যা হবার আজ (১৪ জানুয়ারি) রাতের মধ্যেই হয়ে যাবে। জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা ১১ দলীয় জোট টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাতেও বৈঠকে মিলিত হবেন নেতারা। আশা করছি, এই বৈঠকে সন্তোষজনক সমাধান হয়ে যাবে।”
জোটের শরিকদলের একটি সূত্র জানায়, আজকে রাতের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে সমাধান না হলে জোটটি ভেঙে যেতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে তা হবে দুঃখজনক। আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেলে জোট থেকে চরমোনাইপীরের ইসলামী আন্দোলন ও মামুনুল হকের খেলাফত আন্দোলন বেরিয়ে যেতে পারে।
জানা গেছে, ৩০০ আসনের মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫টি আসন দিতে চায় ইসলামী আন্দোলনকে। আর ৩০টি এনসিপি, ১৫টি মামুনুল হকের খেলাফত মজলিস।বাকি ছোট দলগুলোকে কিছু আসন ছেড়ে দিয়ে অধিকাংশ আসন চায় জামায়াত। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের দাবি, যেসব আসন জামায়াত চায়, তার মধ্যে অনেক আসনে জামায়াতের প্রার্থীর শক্ত ভিত নেই। সেসব আসনও জামায়াত চায়। আর অনেক আসনে ইসলামী আন্দোলনের শক্তিশালী প্রার্থী ও জনপ্রিয়তা থাকলেও এমন অনেক আসন তাদের দেওয়া হচ্ছে না।এ নিয়ে টানাপোড়েন জামায়াতের সঙ্গে। টানাপোড়েনের মধ্যে যুক্ত হয় তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত আমিরের সাক্ষাৎ ও জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবনা। যা জোটে আলাপ আলোচনা হয়নি।
দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন ৫০ থেকে ৬০টি আসন চায়।তার কম হলে জোটে নাও থাকতে পারে। আর খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক ২০ থেকে ২৫, এনসিপি কমপক্ষে ৪০টি আসন চায়। আর এসব আসন দিতে গেলে জামায়াতকে অনেক আসন ছেড়ে দিতে হবে।এতে দলটির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট দলগুলো চায়, ৩০০ আসনে জোটের দলগুলোর মধ্যে যে যেখানে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী সেসব আসন যেনো তাদের মধ্যেই বণ্টন করা হয়। বিএনপির সঙ্গে লড়াই করে জিতে আসতে পারে এমন প্রার্থী ও দলকে যেন ওই নির্দিষ্ট আসন সমঝোতায় ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু জামায়াত এই অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত, পাল্টা বক্তব্য ইসলামী আন্দোলনের:
আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের নির্বাচনি আসন সমঝোতা নিয়ে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। দুপুর সোয়া ২টার দিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, “আজ ১৪ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টায় আন্দোলনরত ১১ দল ঘোষিত সংবাদ সম্মেলন অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে।”
জানতে চাইলে ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের জানান, ‘অনিবার্য কারণে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের তারিখ জানানো হবে।’
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জামায়াত সাংবাদিকদের আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। সেখানে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের আসন সমঝোতা বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণার লক্ষ্যে আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
কিন্তু ইসলামী আন্দোলন এক বিবৃতিতে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে। বুধবার দলের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান এক বিবৃতিতে বিষয়টা পরিস্কার করেছেন।
তিনি বলেন, “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একবক্স নীতিতে অটল-অবিচল থেকে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ও সমঝোতায় আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।তবে আজকের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির কাউকে কোনো অনুরোধ করে নাই। ‘ইসলামী আন্দোলনের আমিরের অনুরোধে ১১ দলের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত’ বলে যে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে তার সত্যতা নাই।”
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট আলাদা করার দাবিতে তার আগেই একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করছিল ইসলামী ৮টি দল। সেগুলো হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। পরে আসন সমঝোতা করে একসঙ্গে নির্বাচনের সিদ্ধান্তও নেয় তারা। পরে সমঝোতায় যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
ঢাকা/এসবি