ঢাকা     শুক্রবার   ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ৩ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

জাতীয় সংসদ নির্বাচন: হত্যাকাণ্ডে বাড়ছে ‘আতঙ্ক’

মাকসুদুর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৫১, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৭:৫৩, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
জাতীয় সংসদ নির্বাচন: হত্যাকাণ্ডে বাড়ছে ‘আতঙ্ক’

ওসমান হাদি, আজিজুর রহমান (মাঝে),ফাতেমা আক্তার। আনোয়ারুল্লাহ (নিচে ডানে), আলমগীর হোসেন,রানা প্রতাপ বৈরাগী।

কয়েক দিন পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে ভোটার, সাধারণ নাগরিক সবাই উদ্বিগ্ন।

গত বছর গড়ে প্রতিদিন ১১ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।তবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্নসহ জানমালের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে আছে বলে দায়িত্বশীলরা বলছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খল বাহিনী দিয়ে নয়, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

আরো পড়ুন:

গত বছরের ১৭ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরে স্থানীয় বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনি প্রচারের সময় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে পুরানা পল্টন কালভার্ট রোডে মোটর সাইকেল করে আসা দুর্বৃত্তরা গুলি করে পালিয়ে যায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,পরে বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই ঘটনার পর গত ৫ জানুয়ারি যশোরের মণিরামপুরে বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, রানা প্রতাপ বাজারে তার নিজের বরফকলে বসে ছিলেন। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত তাকে ডেকে পাশের একটি গলিতে নিয়ে যায়। সেখানে তার মাথায় খুব কাছ থেকে ৩ থেকে ৭টি গুলি করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতে পরে তার গলাও কেটে দেয় দুর্বৃত্তরা।

বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) মনিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রাজিউল্লাহ খান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে এখনো পযন্ত আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে ঘটনার পর থেকে শহরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”

এর আগে গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুরে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।গত ৬ জানয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করা হত্যা করা হয়। তিনি রাউজান উপজেলা যুবদলের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির। ১০ জানুয়ারি রাজধানীর বনশ্রীতে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তার নাম ফাতেমা আক্তার লিলি। ১২ জানুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা থেকে জামায়াত নেতা ও চিকিৎসক  আনোয়ারুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে।”

আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক) বলছে , ২০২৫ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন খুন হয়েছেন, যা আগের দুই বছরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে শুধু গত বছরই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেশি। এ ধরনের সহিংসতা নির্বাচনের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ১০২ জন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব মিলিয়ে গত বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৭৮৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৩টি বেশি।
পুলিশের মুখপাত্র (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারপরও কিছু কিছু অপরাধ সমাজের সংগঠিত হচ্ছে। তবে সেগুলোকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি, অপরাধীদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, হত্যাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতাই অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে।অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “যারা ব্যবস্থা নেবেন বা সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন, তারাই যখন টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনাকে হালকাভাবে দেখেন, তখন অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে তারা নানা উপায়ে আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের দুর্বলতাও এ ধরনের অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দেয়। যা নির্বাচনি পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা কঠিন হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও আরো সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নইলে নির্বাচনের আগে সহিংসতার ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।”

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, “সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বা আইন হাতে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধী যে দলের বা মতাদর্শেরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। নিবাচন সুষ্ঠু, বিশৃঙ্খলামুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সম্পন্ন করতে পুলিশ তথা সরকারের পক্ষ থেকে যা যা করণীয় তার সবকিছু করা হবে। আমরা একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে প্রতিটি মানুষ নির্ভয়ে চলাচল বা ভোট দিতে পারবে।”

ঢাকা/এমআর/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়