ঢাকা     শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২০ ১৪৩২ || ১৪ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

জাদুবিদ্যা ডাইনিতন্ত্র ভূতপ্রেত

ইবনুল কাইয়ুম সনি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:০৭, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
জাদুবিদ্যা ডাইনিতন্ত্র ভূতপ্রেত

জাদুবিদ্যার চর্চা

ইবনুল কাইয়ুম সনি
ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারি : সেই মানব সভ্যতার শুরু থেকে জাদুবিদ্যা আর জাদুকর এই দুইয়ের প্রতিই মানুষের আগ্রহ সীমাহীন। পৃথিবীর মানুষের লোকসংস্কারের একটা বড় অংশই হলো জাদুবিদ্যা।

জাদুবিদ্যা মূলত অতিন্দ্রিয় আর প্রাকৃতিক শক্তিকে বশ করার বিদ্যা! ইংরেজি ম্যাজিক শব্দের উদ্ভব হয়েছে ফার্সি মাজি থেকে। মাজি ধর্মাবলম্বীরা যে সব ক্রিয়া-কর্ম পালন করতো, গ্রীকরা তাকেই ম্যাজিক বলে অভিহিত করতেন।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমাজাবিদ আর নৃত্বাত্তিকরা সমাজে প্রচলিত জাদু বিধানগুলো পর্যালোচনা করে এদের বিভিন্ন শ্রেণি বিভাগ করার চেষ্টা করেছেন। যেমন স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজারের মতে জাদুবিদ্যার বিধানগুলো প্রধানত দুই রকমের

১. হোমিওপ্যাথিক ম্যাজিক (Homeopathic Magic) :

এই জাদু বিধান সর্বকালে সব দেশে শত্রু ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে শত্রুর প্রতিমূর্তি (মোম, মাটি, কাঠ, কাপড়) বা ছবি ইত্যাদি তৈরি করে পুড়িয়ে বা ছুরি দিয়ে কেটে ধ্বংস করা হয়। ধারণা এই যে, মূর্তিটা যে যন্ত্রণা পাচ্ছে, শত্রুও তেমন যন্ত্রণা বা আঘাত পাচ্ছে। এটাকে ব্ল্যাক ম্যাজিক বলে।

তবে এই জাদু আবার অনেক সময় মানুষের উপকার বা ভালর জন্যেও ব্যাবহার করা হয়। যেমন ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে এমন একটা জাদু বিধান আছে, কোনো নারীর সন্তান হচ্ছে না, তখন একটা কাঠের ছোট শিশু বানিয়ে নিঃসন্তান রমনীটির কোলে বসিয়ে আদর করে। এর ফলে তার সন্তান হবে এমন ভাবা হয়।

কখনো কখনো রোগের চিকিৎসার জন্যও এই ধরণের জাদুর প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন প্রাচীন হিন্দু সমাজে জন্ডিস (পান্ডুর) রোগের চিকিৎসার জন্য মন্ত্র পাঠ করে রোগীর চোখের হলুদ অংশ সূর্যের কাছে পাঠানো হত!

২. কনটেজিয়াস ম্যাজিক (Contagious Magic) :

এই ধরনের জাদু বিধানের মাধ্যমে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিশেষ যেমন চুল, নখ, থুথু বা পরিধেয় বস্ত্রের মাধ্যমে জাদু করে মানুষের ক্ষতি বা উপকার দুটোই করা সম্ভব! মালয়ে এমন এক ধরনের জাদু বিধানের প্রচলন দেখা যায়। শত্রুর আঙ্গুলের নখ, চুল, ভ্রু, থুথু -এসব সংগ্রহ করে মোমের সাহায্যে শত্রুর একটা অবিকল প্রতিরূপ তৈরি করা হয়। প্রতিমূর্তিটি ছয় দিন ধরে মোমের তাপে ঝলসাতে হবে এবং সাত দিনের দিন মূর্তিটি পুড়িয়ে ফেললে শত্রুর মৃত্যু হবে!

জাদুবিদ্যার ধরন আর প্রাকরভেদ নিয়ে অনেকে অনেক মত দিয়েছেন, তাদের সকল মতবাদ একসাথে করলে বলা যায় জাদুবিদ্যা প্রধাণত তিন ধরণের।

১. সৃজনধর্মী জাদু বা হোয়াইট ম্যাজিক : ফসলের ভাল উৎপাদন, বৃষ্টি নামানো, গাছে ভাল ফল হওয়া, প্রেম বা বিয়ে ইত্যাদির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত জাদু। এটাকে বলা হয় হোয়াইট ম্যাজিক।

২. প্রতিরোধক জাদু : এই জাদুও হোয়াইট ম্যাজিকের মধ্যেই পড়ে। এটা বিপদ আপদ এড়ানো, রোগব্যাধি দূর করা আর কালো জাদুর প্রভাব এড়াবার কাজে ব্যবহার করা হয়।

৩. ধ্বংসাত্মক জাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিক : রোগব্যাধি সৃষ্টি, সম্পত্তি ধ্বংস, জীবন নাশের কাজ ব্যাবহার করা হয়। ডাইনিবিদ্যায় এর প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। এটাই হলো ব্ল্যাক ম্যাজিক। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ পর্যন্ত এর প্রভাব দেখা যায় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উপর।

জাদুবিদ্যার প্রাচীন ইতিহাস যদি আমরা খুঁজে দেখতে চাই তাহলে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে সেই প্যালিওলিথিক যুগের গুহামানবদের গুহাচিত্রের দিকে।

অরিগেনেসিয়া নামক গুহায় বেশ কিছু মুখোশ পরা মানুষ আর জন্তু জানোয়ারের ছবি দেখা যায়, যেখানে মানুষগুলোর হাতের আঙ্গুলের প্রথম গিট পর্যন্ত কাটা! যদিও নৃত্বাত্তিকেরা এদের কুষ্ঠরোগাক্রান্ত মানুষ বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে জাদুবিদ্যা বিশারদদের মতে মৃত্যুকে জয় করার জন্যই হাতের আঙ্গুল কেটে তা নিবেদন করার রীতি সে আমলে প্রচলিত ছিল। দেহের অংশ বিশেষ দিয়ে গুণ (ব্লাক ম্যাজিক) করার রীতি বাংলাদেশেও দেখা যায়!

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতেও নানা আঙ্গিকের জাদুবিদ্যা চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায় সমসাময়িক ধর্মগুরু আর জনগণের মধ্যে!

পারস্যের জোরেয়াস্তার (আনুমানিক ১০০০ খ্রী. পূর্ব) মাজিয়ান ধর্মের প্রচলন করেছিলেন। যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ভাল ও মন্দের মধ্যের ভালোর জয় লাভ। কিন্তু পরে এ ধর্মমতের মধ্যে জাদুবিদ্যার উদ্ভব হয়!

মাজিয়ানদের ধর্মীয় আচার অনুষ্টানগুলো পালনের নেতৃত্ব দিত যারা, তাদের বলা হতো মাজি। এই মাজিরা মূলত জ্যোতিষী বা গনক হিসাবে পরিচিত ছিল। এরা সূর্য, চন্দ্র, মাটি, পানি বাতাস প্রভৃতির উদ্দ্যেশে শিশু ও পশু বলি দিয়ে দেহের রক্ত শুদ্ধ করত।

ইহুদিদের বাইবেল (ওল্ড টেস্টেমেন্ট) জাদুবিশ্বাসের উল্লেখ আছে। "মোশি যখন সদাপ্রভুর অস্তিত্ব নিয়ে জনগণের সন্দেহের কথা বলছিলেন, তখন সদাপ্রভু তাকে বললেন, ‘তোমার হস্তে ওখানি কি? মোশি কহিলেন ষষ্টি। তখন তিনি কহিলেন, উহা ভূমিতে ফেল।’ পরে তিনি তা ভূমিতে ফেললেন। ষষ্টি সর্প হইলো। তখন সদাপ্রভু বলিলেন, ‘উহার লেজ ধর। মোশি সাপের লেজ ধরা মাত্রই তা আবার লাঠি হয়ে গেল! "

আল-কুরআনের সুরা বাকারা (৩৫ রুকু, ২৬৯ আয়াত) একটি অংশের কথাও উল্লেখ করা যায়। "আরও স্মরণ কর সেই সময়ের কথা, ইব্রাহীম যখন বলিয়াছিল, হে আমার প্রভু, মোর্দ্দাকে তুমি জেন্দা করিবে কিভাবে, তাহা আমাকে দেখাইয়া দাও। আল্লাহ ইরশাদ করিলেন, তবে তুমি ইহা বিশ্বাস কর নাই। ইব্রাহীম উত্তরে বলিল, হাঁ (বিশ্বাস করি) তবে আমার অন্ত:করণ স্বস্তিলাভ করুক এই জন্য (প্রার্থনা); আল্লাহ বলিলেন, তাহলে তুমি চারটা পাখি গ্রহণ কর এবং সেগুলোকে নিজের প্রতি অনুরক্ত করিয়া লও, তাহার পরে সেগুলো আলাদা আলাদা চারটি পর্বতের উপর রাখিয়া তাহার পর ডাক দাও সেগুলোকে-দেখিবে তাহারা ছুটিয়া আসিতেছে তোমার কাছে...।

তবে উল্লেখ্য যে, আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে জাদুবিদ্যার নিন্দাবাদ করা হয়েছে।

মূলত হযরত মুহাম্মদ (স:) এর নবুয়ৎ প্রাপ্তির আগ পর্যন্ত সেমেটিক জাতিগুলোর মধ্যে ব্যাপকভাবে জাদুবিদ্যা চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়! মেসোপটেমিয় সভ্যতাগুলো থেকে জাদুবিদ্যার প্রচুর ট্যাবলেট পাওয়া গিয়েছে, যেখানে উল্লেখ রয়েছে তিন শ্রেণির পুরোহিতের কথা।

১. বারু : এরা ছিল জাদুকর ও গুণিক। এরা মৃত প্রানীর যকৃৎ, নাড়ি ভুঁড়ি দেখে ভবিষ্যৎ গণনা করতো।

২. অসিপু : এরা ছিল পুরোহিত শ্রেণির ওঝা। এরা ভূত-প্রেত তাড়াত।

৩. প্রাচীন মিশরীয় : জাদুবিদ্যায় যারা সবচাইতে বেশি ভূমিকা রেখেছে তারা হলো প্রাচীন মিশরীয়রা। চতুর্থ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হবার আগে থেকেই মিশরে ব্যাপকহারে জাদুবিদ্যার চর্চা শুরু হয়। ভুত প্রেতের আছর থেকে শুরু করে রোগব্যাধির নিরাময় এমন কি সাপে কাটলেও তার প্রতিকারের জন্য আলাদা আলাদা জাদুবিদ্যার আশ্রয় নিত এরা। আর এইসব কাজ করার জন্য আলাদা আলাদা ওঝা ছিল। এরা নিগ্রো আর এশিয়ার মৃত নারীর আত্মা সম্পর্কে খুব ভয় পেত, আর ভয় করতো নিজের আত্মা হারানোর! তারা মনে করত জাদুকরেরা ইচ্ছা করলে জাদুর সাহায্যে অন্যের আত্মাও চুরি করতে পারে।

তৃতীয় রামেসেসের সময়ে হুই নামের এক জাদুকর সম্রাট রামেসেস ও তার পরিবারের সব সদস্যদের মূর্তি বানিয়ে এর মাধ্যেম রামেসেসের বংশ ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রও করেছিল একবার।

ইহুদিরা মিশরে বন্দী অবস্থায় অবস্থানের সময়েই মিশরীয় জাদুবিদ্যার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। অবশ্য তাদের নিজেদেরও আলাদা বৈশিষ্ট্যময় জাদু বিশ্বাস ছিল। তাদের বিশ্বাস মতে স্বর্গভ্রষ্ট আদম পৃথিবীতে জাদুবিদ্যাসংক্রান্ত একটা বিশেষ বই এনেছিলেন, যার নাম দ্যা বুক অব রাজিয়েল! আবার কারো কারো মতে স্বর্গভ্রষ্ট ফেরেশতা উজ্জা ও আজাইল একজন নারীকে জাদুবিদ্যার গান শিখিয়েছিলেন।

ইহুদি জাদুকরেরা বাস্পস্নানের মাধ্যমে বলি আর উপহার দিয়ে অতিপ্রাকৃত শক্তিকে বশ করার চেষ্টা করতো। এদের জাদু চর্চায় স্থুল যৌনাচার হত। এছাড়া অল্পবয়স্ক বালকদের ব্যবহার করতো অতিন্দ্রিয় শক্তির সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে। তারা মনে করতো জাদুবিদ্যার সবার পক্ষে আয়ত্ব করা সম্ভব না, শুধুমাত্র বিশেষ দক্ষ ব্যক্তিদের পক্ষেই এটা সম্ভব। আর এই বিশেষ দক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো কিং সলোমন! তার ` কি অফ সলোমান` বইটি পরবর্তীকালে জাদুবিদ্যার সর্বশ্রেষ্ঠ বই হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতেও জাদুবিদ্যা আর ধর্মের একটা জটিল সংমিশ্রণ দেখা যায়। স্বপ্নব্যাখ্যাও প্রাচীন জাদুবিদ্যার অঙ্গরূপে স্বীকৃতি পেয়েছিল। যেমন কৌশিক সূত্রে অনিষ্টকারী ভুত প্রেতাত্মাকে তাড়ানোর জন্য সেই অশুভ শক্তির উদ্দেশ্যে পাখি যে ডালে বাসা বাধে, সেই ডালের লাকড়ি দিয়ে রান্না করে খাবার উৎসর্গের কথা বলা আছে। কিছু বৈদিক ক্রিয়া অনুষ্ঠানে বলি দেওয়া পশুর নাড়ি ভুঁড়ি ও অন্যান্য অংশ রাক্ষস আর সাপকে উৎসর্গ করা হতো।

এখনকার সমাজেও এমন অনেক বৈদিক জাদুবিদ্যাগত প্রক্রিয়া এখনো চালু আছে। হরপ্পা মহেঞ্জোদারতে উৎখননে প্রাপ্ত রিং স্টোনগুলো জাদুবিদ্যায় ব্যাবহার করা হতো বলে জন মার্শাল ধারণা করেন। বলা হয়, কেউ যদি এর পাশ দিয়ে যায় তাহলে তার পাপ খণ্ডন হবে! যেমন আফজাল খানকে হত্যার পরে পাপ খণ্ডন করার জন্য শিবাজী এই পাথরের তলা দিয়ে পার হয়েছিলেন!

জাপানের প্রাচীন শিন্টো ধর্মের মধ্যে জাদুবিদ্যার প্রচুর উদাহরণ দেখা যায়। জাপানিরা বিশ্বাস করে, চালের মধ্যে ব্লাক ম্যাজিক প্রতিহত করার বিশেষ শক্তি আছে। এছাড়া রাস্তার সংগমস্থলও তাদের কাছে বিশেষভাবে পবিত্র। এসব স্থানে তারা এখনও জননেন্দ্রীয়ের প্রতিক চিহ্ন স্থাপন করে, বিশ্বাস করে এই প্রতিক অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখবে!

জাপানিদের মতো চীনাদেরও ভুত প্রেত সম্পর্কে বেশ ভালই ভয় ভীতি ছিল। মজার ব্যাপার হলো, চীনের ঘরবাড়ি ও পুল নির্মানে একটা বিশেষ দেবতা চীনাদের প্রভাবিত করেছে। এই দেবতার নাম হলো শা। শা হলো একটা অপদেবতা। আর চীনারা বিশ্বাস করে এই অপদেবতা সব সময়ে সোজা রেখা বরাবর চলে। তাই এটাকে প্রতিহত ছাদে আঁকা হত বক্রতা আর কোণ!

পরবর্তীকালে তাওবাদ যেমন চীনা লোকসংস্কারকে প্রভাবিত করে, তেমন করেছিল কনফুসিয়াস। কনফুসিয়াসের `আই চিং` প্রধানত ভবিষ্যৎ গণনার জন্যই নির্দিষ্ট ছিল।

জাদুবিদ্যা চর্চায় প্রাচীন গ্রীক আর রোমানরাও কম ছিলেন না। তাদের জাদুবিদ্যার দেবী হেকেটি। জাদু বিধান প্রয়োগের জন্য বিশেষ স্থানে নির্বাচিত করা হতো। যেমন- গোরস্তান বা রাস্তার সংগমস্থল!

গ্রীকরা জাদুবিদ্যার জন্য বিশেষ বর্ণমালার সৃষ্টি পর্যন্ত করেছিল। এগুলো লেখা হতো পবিত্র কালি দিয়ে। আর লেখার সময় বার বার পাঠ করা হতো। ধারণা করা হতো এভাবেই জাদুকর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে! ওয়ার উলফের ধারণটাও এদের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছিল! এছাড়া এরা ফেব্রুয়ারির শেষ বা মার্চের প্রথম সপ্তাহে তিন দিন ধরে প্রেতাত্মাদের উদ্দেশ্য একটা বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করতো, এখনও করে।

রোমান জনসাধারণ `বদ নজর` (evil Eye) কে বিশ্বাস করত! তারা মনে করত কুনজর লাগিয়ে মানুষ থেকে শুরু করে শস্য গবাদি সব কিছুরই ক্ষতি করা সম্ভব! এই ধারণটা আমাদের দেশে এখনও দেখা যায়। ছোট ছোট শিশুদের কপালে বা পায়ের নিচে কাজলের টিপ লাগিয়ে কুনজর দূরে রাখার রীতি এখনও প্রচলিত আমাদের দেশে।

অন্য জাতির মতোই রোমানারও ভবিষ্যত জানবার সকল উপায় উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেছিল। রোমান জাদুকরেরা স্বপ্ন বিচার, কোষ্ঠি বিচার থেকে শুরু করে নারী বশিকরণ করার জন্য নানারকম প্রসাধনীও বিক্রি করত! একটা কথা না বললেই নয়, বর্তমানের রূপচর্চার বহুল ব্যবহৃত প্রসাধন দ্রব্য শুরুতে শুধু জাদুবিদ্যার কাজেই লাগানো হত!

এভাবে প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন সভ্যতায় মানুষের জীবন ও কল্পনায় জাদুবিদ্যা প্রভাব বিস্তার করতে থাকলেও মধ্যযুগে এসে এটা দানবীয় রূপ ধারণ করে। আর জাদুবিদ্যার পরিবর্তীত রূপে শয়তানবাদের চর্চা বেশির ভাগ দেশেই পূর্নতা পায়! এই সময়ে জাদুবিদ্যার যে নিরঙ্কুশ চর্চা হয়, তা ছিল নিষ্ঠুরতা, হিংস্রতা, লালসায় ভরপুর।

এই সময়ে প্রতিটা জাদুকরকে শয়তানের কাছে বিশেষ প্রক্তিয়ায় চুক্তি বদ্ধ হতো। সকলেই দাবি করতো যে, সে কোনো দেব-দেবীর শক্তিকে আয়ত্ব করে রেখেছে।

সাপ, ব্যাঙ, বিড়াল ও পেঁচা মধ্যযুগীয় জাদুবিদ্যায় অবশ্যকীয় পশু-পাখি হিসাবে গণ্য করা হত। লোকের ধরণা ছিল আংটি, শিশি, বোতল ও বাক্সে ভুত প্রেত, দৈত্য দানবকে বন্দী করে রাখা সম্ভব! এখন এসব শুনতে হাস্যকর লাগলো, সে সময়ে এটাই ছিল বাস্তব!

এই সময়ের একজন বিখ্যাত জাদুকর ছিলেন যোহান রোসা। তার একটা মন্ত্রপুত অংটি ছিল, যেটায় একটা প্রেত্মাত্মাকে তিনি আটকে রেখেছিলেন আর এটাকে দিয়ে সব কাজ করাতেন! তার মৃত্যুর পরে প্রকাশ্য জন সভায় আংটিটা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়ছিল।

গর্ভবতী নারীদের প্রসব বন্ধ করা থেকে শুরু করে যৌনাকাঙ্খা চরিতার্থ করার মত বিভৎস সব জাদু বিধানের চর্চা হতো তখন। এসময়ে বিশ্বাস করা হতো বশীকরণের মাধ্যমে মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা যায়। যে কোনো বিপজ্জনক কাজে যাবার আগে ‘প্রয়োজনীয় মন্ত্রপুত জামা’ পরে যাবার রীতি ছিল। কুমারী মেয়েরা বড়দিনের এক সপ্তাহ ধরে এই ধরনের জামা ঘরে বুনত।

`বান` ছোড়ার কথা বাংলাদেশে অপরিচিত নয়, মধ্যযুগের এই (Magical Arrow) ধারণাটার ব্যাপক প্রচার ছিল। বিশ্বাস করা হতো এভাবে মানুষের ক্ষতি করা সম্ভব! মধ্যযুগে রেনেসাঁর আলো যতই ছড়াক না কেন, জ্যোতিষীদের হাত থেকে কেউই রক্ষা পায়নি। অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রভৃতি কারণে জনমানসে তখনও ভবিষ্যত জানার প্রবল স্পৃহাই এর কারণ ছিল। পরবর্তীকালে হাজার হাজার ঐন্দ্রজালিক ও ডাইনি হত্যা করা হয়েছিল। (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

 

 

রাইজিংবিডি / সনি / কে. শাহীন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়