ঢাকা     শনিবার   ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ধ্রুব এষ একটা আকাশ

হাসনাত মোবারক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:০০, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৮:১৯, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
ধ্রুব এষ একটা আকাশ

ধ্রুব এষ একটা বাগান। সেই বাগানের শস্যের সুবাস নিয়ে বাড়ি ফিরি রোজ। বাড়ি ফিরি! নাকি তার সৃজনকল্পের প্রতিবেশে ঘোরাফিরি করি সর্বক্ষণ। তার চিন্তার জগৎ কি ধরতে পারি? হয়তো পারি। আর না পারলেও আক্ষেপ নেই। একদিন বললেন, ‘ধরো তোমার লেখা কেউ-ই পড়লো না। তাতে কি তুমি লেখা বন্ধ করে দেবে?’

শুনে নীরব থাকি। তিনি বলেন, ‘শোনো কাজেই আনন্দ। খেটে খাই।’ এ কথাটি তিনি বরাবরই বলেন ‘যেদিন থেকে কাজ করবা না, সেদিন থেকে তোমার কানাকড়ি মূল্যও নেই। অন্তত আমার কাছে।’

সিদ্ধান্ত নিয়েই চারুকলায় ভর্তি হন, বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে চা, সিগারেট, ভাত খাবেন। সেই থেকে বিরতিহীন আঁকছেন বইয়ের প্রচ্ছদ। জীবনের মতোই তিনি বই ভালোবাসেন। এ কারণেই হয়তো প্রচ্ছদ গড়ার কারিগর হিসেবে ইতিহাস রচনা করে ফেললেন। চার দশকে তিনি কত হাজার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন? এই হিসাব তার কাছে আছে? না। নেই। হিসাবের ভার তিনি বহন করতে আগ্রহী নন। চাপ অনুভব করেন। 

একদিন জানালেন, ‘সম্ভব! ধরো, প্রচ্ছদ এঁকেছি, লেখকের সংখ্যাই দুই হাজারের বেশি। এত মানুষের নাম মনে রাখা যায়?’

যোগ করে বলি, এমন লেখকও আছেন, যাদের তিনশ বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। শুনে হেসে বলেন, ‘একটা মজার গল্প বলি, শোনো। শুরুর দিকের কথা। হ‍ুমায়ূন স্যার প্রকাশকের মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠালেন। গেছি। স্যার শুরুতেই বললেন, শোনো ভাই। তোমার প্রচ্ছদ পছন্দ না হলে আমি কিন্তু নেব না। আমি মাথা নাড়লাম। বেরিয়ে এসে প্রকাশককে বললাম, শোনেন ভাই, প্রয়োজনে একশটা প্রচ্ছদ বানাবো। পরে অবশ্য স্যার প্রথম প্রচ্ছদটাই পছন্দ করলেন। (স্মিত হেসে) কী বলি, আমার একশটা প্রচ্ছদ বানানোর সেই কথা স্যারের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও স্যার এই কথা আমাকে অনেক পরে বলেছিলেন। শোনো এসব কথা গোপন থাকে না কখনো। আমরা তো বুঝি না।’

২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি। এক বছরের তার কয়টা গল্পের কথা আমরা জানি! ধরেন, কিছু গল্প তিনি লিখেছেন পত্রিকায়, ঈদ ম্যাগাজিনে, ওয়েবজিনে, লিটল ম্যাগাজিনে। আর কিছু গল্প এঁকেছেন প্রচ্ছদ হিসেবে। যা আছে বইয়ের ভাঁজগন্ধে। সেগুলো দূর ভবিষ্যতে কেউ কেউ পড়বেন হয়তো। আগেই তো বলেছি, কেউ না পড়লেও তার কলমের নিব থামবে না।

রেল লাইনের সমান্তরাল দুই বাহুর মতো প্রবাহমান ধ্রুব এষ। এগিয়ে চলছেন। একদিন বোকার মতো জানতে চাইলাম, ‘দাদা আপনার বই দুইশ হইছে?’ মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফিক করে হেসে দিলেন। বললেন, ‘তা মনে হয় হইসে রে ভাই। ওই যে কিছু বই আছে- এক গল্পে এক বই। ওইটা কি তুমি বইয়ের সংখ্যার বিচারে ধরবা?’

আমি হেসে যুক্ত হই, ‘এমন অনেকেই তো আছেন, এ-বই ও-বই থেকে গল্প নিয়ে নতুন নাম দিয়ে বই প্রকাশ করে তালিকা ভারি করছেন।’ তখন তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘শোনো অন্যের সঙ্গে আমাকে কখনোই তুলনায় আনবা না। আরেকটা কথা শোনো- তোমাকে যার মাধ্যমে চিনি, ওই লোকটার কথা মাথায় আছে? তোমার কত বড় সৌভাগ্য বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গ পাইসো।’ সেদিনের মতো শেষ করলেন, ‘গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায় তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়’ বলে।

কথা হচ্ছে ধ্রুব এষকে নিয়ে। সঙ্গত কারণেই বুলবুল চৌধুরীর প্রসঙ্গ আসবে। একদিন তিনি বললেন, ‘জানো বুলবুল ভাই আমার মা, বাবা, মাসি, পিসি, ভাই, বোন। সবই এ একটা মানুষ।’ 

বর্ষা শেষের একদিন। মাসুক হেলাল আসবেন তার বাসায়। মিরপুর থেকে রওনা দিয়েছেন। আমি সকাল থেকে সে বাসায় উপস্থিত। উঠব, এমন সময় ধ্রুবদা বললেন, ‘শোনো, মাসুক ভাই আসতেছেন।’
বসে পড়লাম। মাসুক ভাই এলেন, এক হাঁড়ি খাবার নিয়ে। শুরুতেই ধ্রুবদা বললেন, ‘মাসুক ভাই ওকে চেনেন?’
‘হ চেনব না কেনো? ও লেখা নিয়ে ছাপছে কয়বার। মনে আছে,’ বললেন মাসুক ভাই। 
ধ্রুব দা তখন বললেন, ‘না মাসুক ভাই। এটা ওর প্রকৃত পরিচয় না। ওর আরেকটা পরিচয় আছে। দেখি বলেন তো মাসুক ভাই, ও কে?’
মাসুক ভাই তাকিয়ে রইলেন। ধ্রুবদা তখন বললেন, ‘ও হলো বুলবুল ভাইয়ের সর্বশেষ মুরিদ। এ কারণেই ওকে দেখে রাখার দায়িত্ব আমাদের।’

অনুজপ্রতিম যারা লেখেন, ছবি আঁকেন, তাদের সবার প্রতি এমন অধিকার ও কর্তব্য পালন করেন একজন ধ্রুব এষ। মায়ার বাঁধনে আগলে রাখেন সবাইকে। এজন্য তিনি একটা আকাশ। সেই সুনীল আকাশের বুকে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় কত কত রঙের পাখি!

সদ্যবিদায়ী বছরের শেষ মুহূর্তে গিয়ে বললাম, ‘আমার ধারণা কয়েক বছরের মধ্যে আপনি সবচেয়ে বেশি পেইন্টিং করেছেন।’ শুনে বললেন, ‘কী-ই?’ তারপর ফিক করে হেসে দিলেন, ‘আমি সারাজীবন প্রচ্ছদের জন্য ছবি আঁকছি। শোনো পেইন্টিং করছি সেই চারুকলায়।’ আবদার করি, ‘একটা এগজিবিশন করব আমরা।’ ধমকের স্বরে বললেন, ‘কী? কী? মাথায় আনবা না এসব। আমার ওসবের দরকার নেই। বইয়ের প্রচ্ছদেই থাকতে চাই। যতদিন বাঁচি।’

‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর উপন্যাসের সাত-আটটা প্রচ্ছদ এঁকেছেন তিনি। এই উপন্যাসের জন্য নতুন আরও একটা প্রচ্ছদ এঁকেছেন। সেটি ২৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে একটা দৈনিকের সাময়িকীতে ছাপা হলো। সেদিনই সন্ধ্যায় যাই তার বাসায়। দেখি নিবিষ্ট মনে ছবি আঁকছেন। চুপচাপ ঘণ্টাদেড়েক বসে থাকার পর সিদ্ধান্ত নিলাম উঠব। এমন সময় তিনি বলে উঠলেন, ‘যাও পানি গরম দিয়ে আসো।’ শিল্পী ছবিতে রঙ চরাচ্ছেন আপনমনে। এমন দৃশ্য মোবাইলে শিকার করে নিলাম। সম্ভবত সেদিনই ছিল ছবিটি নামানোর শেষ মুহূর্ত। 

রাতে বাসায় ফিরে মোবাইল থেকে জুম করে ছবিটি দেখা শুরু করি। তার পেইন্টিংয়ের মধ্যে আমার ফেলে আসা একটি গল্প খুঁজে পাই। কী অদ্ভুত! শিল্পী ধ্রুব এষ কল্পনার গল্পে রঙ মিশালেন আমার শৈশবের দৃশ্যগল্পে! ছবির দৃশগল্পের মধ্যে ঢুকে যাই। চিত্রকর্ম আর আমার দেখা গল্প, দুটি পাশাপাশি রাখি। ফিরে যাই গত শতাব্দীর শেষের দশকে। চলনবিলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ৫৭টি নদী। সেই নদীগুলোর একটি নদী ‘গোহালা’কে আমি দেখতে পাই ধ্রুব এষের পেইন্টিংয়ের মধ্যে। সেই নদীর দুই পাড়ে বসতি। বর্ষার শুরুতে ওই নদী দিয়ে বাছের বাইদ্যা দলবল নিয়ে আসতেন। বেদেনিরা চলনবিলের গ্রামের গ্রামে ফেরি করে বেচে ফিরতেন, মনোহারি সওদাপাতি। আর বাছের বাইদ্যারা ছই তোলা নৌকার মধ্যে ঘরকন্যা করতেন। বেদের দল এই কর্ম করে বেড়াতেন কার্তিক মাস পর্যন্ত। তারপর বেদের বহর যে নদীপথে গন্তব্যে ফিরে যেতেন। সেই নদীটি ভেসে উঠলো শিল্পীর সদ্য আঁকা চিত্রকের্মর ভেতর।

ধ্রুব এষ পেইন্টিংগুলো ধরেছিলেন আষাঢ় মাসে। কার্তিক মাসে গিয়ে সম্পন্ন হলো তার আঁকা। এটা কী চার্তুমাস্য! বেদের বহরের মতো শিল্পী ধ্রুব এষও কি চারমাসের সাধ্য ব্রত সম্পন্ন করলেন! সেদিন রাতে এমন ভাবনা মাথায় আসে। কিন্তু তিনি তো শীত-গ্রীষ্ম বারোমাসই ব্যাপৃত থাকেন কাজে। তার ছবি আঁকার সন্দর্শনের একটা ঘটনা বলি। ঘটঘট করে হেঁটে এসে চেয়ারে বসলেন। কাগজ কলম আতিপাতি করতে লাগলেন। ব্যাগ থেকে তড়িঘড়ি করে খাতা এগিয়ে দিই। বললেন, ‘এমনি তোমাকে দেখানোর জন্য। তেমন কিছু না, বুঝসো। তোমার হাতের কলমই দাও।’ কলম এগিয়ে দিলাম। রুল টানা খাতায় ঘষঘষ করে তিন টানে পাল তোলা একটা নৌকা আঁকলেন। তার নিচেই আঁকাবাঁকা একটা রেখা টানলেন। বললেন, ‘এই যে আঁকলাম, দেখো। দেখলে তো। এটা এক রকম। আবার ধরো নন্দলাল বসু এটাই আঁকলেন। দেখবা একদম হুবহু চলনবিলের পানিতে ঢেউ যেমন নাচছে। তোমার দেখার সঙ্গে মিলা যাবে। যে চলনবিল তুমি দেইখা আইছো। তোমারে একদিন নিয়া যাব বুঝছো। শুধু যাবো তোমাকে জয়নুল আবেদিন স্যারের ড্রয়িং দেখাতে।’ বলে চুপ হয়ে গেলেন। 

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, ‘শোনো জয়নুল স্যার। এই মানুষটার মধ্যে তুমি বাংলাদেশ খুঁজে পাইবা। দেশ কী? দেশ হলো মা। মায়ের মুখ। আজকেই তোমার মায়ের মুখের দিকে ভালো করে তাকাবা। আর দেশের মাটির সঙ্গে মিলাবা।’

এই হলেন ধ্রুব এষ। যার ধ্যানজ্ঞান মা, মাটি আর মানুষ। এই জমিনই তার সৃজনের উপাদান। লিখছেন, আঁকছেন। ভাবছেন। ১৭ জানুয়ারি পা রাখবেন ষাটে। বালাই ষাট ধ্রুব এষ। সামনের আরও শতক চার্তুমাস্য ব্রত পালন করুন।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়