ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৩ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৮ ১৪৩২ || ১৪ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

‌‘পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতায় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিএসইসি’

নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১১, ৩ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২২:১৩, ৩ মার্চ ২০২৬
‌‘পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতায় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিএসইসি’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন।

“দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে, হয়েছে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আওয়ামী লীগ  সরকারের আমলে পুঁজিবাজার ছিল মূলত কারসাজি চক্রের নিয়ন্ত্রণে। যেখানে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) যোগসাজশে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পকেট কাটা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান কাজ ছিল- বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা, অনিয়ম রোধ করে সুশৃঙ্খল ও টেকসই উন্নয়নের তদারকি নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। সরকারের ওপর মহলের চাপে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আগামী দিনে পুঁজিবাজারে সুশাসন ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিএসইসি।”

দেশের অন্যতম ও শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল রাইজিংবিডি ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট, অতীতের কারসাজি এবং উত্তরণের পথ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন।

আরো পড়ুন:

তিনি মনে করেন, “পুঁজিবাজারের সংস্কার নিয়ে এখন আর আলোচনার সময় নেই, বরং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে দৃশ্যমান কাজ দেখানোর সময় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। নতুন সরকারের ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।”

তিনি বলেন, “পুঁজিবাজারের সাফল্য কেবল সূচকের সবুজ রঙ বা লেনদেনের ভলিউমে নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো কোম্পানির ভ্যালু বা অন্তর্নিহিত শক্তি বাড়ানো। আইনের সঠিক পরিপালন নিশ্চিত করা।রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের পুঁজিবাজার কেবল দেশীয় নয়, বরং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও হবে বিনিয়োগের নিরাপদ জায়গা। এখন মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং একটি স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ এবং পেশাদার বিএসইসিই পারে এই ধ্বংসপ্রায় পুঁজিবাজারকে পুনর্গঠন করতে।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “মানুষ আর কথা শুনতে চায় না, মানুষ এখন দৃশ্যমান কাজ দেখতে চায়। প্রধানমন্ত্রীও কাজের মাধ্যমে প্রমাণ দেওয়ার কথা বলেছেন। তাই পুঁজিবাজার সংস্কারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি। অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারবান্ধব এবং বাজারের খুঁটিনাটি সম্পর্কে অবগত। তাই বিএসইসির দায়িত্ব এমন একজনকে দেওয়া উচিত যার পুঁজিবাজার সম্পর্কে বাস্তবসম্মত জ্ঞান রয়েছে। যিনি পুঁজিবাজার সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, অভিজ্ঞ এবং যার কোনো স্বার্থ সম্পর্কিত দ্বন্দ নেই। যিনি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন এবং বাজারকে স্বাধীনভাবে পরিচালনায় সক্ষম হবেন। দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্বই পারে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে একটি স্বাধীন ও কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব।”

তিনি আরো বলেন, “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট যাদের আছে, তারা বাজারে এসে নিজেদের পক্ষটাই দেখবে। পুঁজিবাজার সম্পর্কে জ্ঞান নেই এবং কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট রয়েছে এমন ব্যক্তিকে যদি বিএসইসির দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটা পুঁজিবাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ এমন একজন বিএসইসির দায়িত্ব পেলেন, যার পুঁজিবাজার সম্পর্কে জ্ঞান নেই। ফলে তার বিষয়টি বুঝে উঠতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তড়িত গতিতে হবে না। এতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে না, যার নেতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারের পরার সম্ভাবনা রয়েছে। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় যদি কোন ব্যক্তিকে বিএসইসির দায়িত্বে দেওয়া হয় তাহলে সেটা আগের চেয়ে আশানুরূপ কিছু দেখা যাবে না।”

পুঁজিবাজারে সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুঁজিবাজারে কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে পাঁচ-ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল লাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং সরকারের হাতে থাকা বড় কোম্পানির বাজারে আনা।”

তিনি বলেন, “এসব প্রক্রিয়া অনেক দূর এগোলেও নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে যদি অন্তত এক-দুইটি মানসম্পন্ন ও লাভজনক কোম্পানি বাজারে আসত, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ত এবং বাজারে গভীরতা তৈরি হতো। বর্তমান সরকারের উচিত, আলোচনার চেয়ে বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কর-প্রণোদনা ও অর্থায়ন কাঠামোয় সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে ভালো ভালো লাভজনক কোম্পানি পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা। মানসম্পন্ন কোম্পানি বাজারে এলে ইকুইটি মার্কেট শক্তিশালী হবে, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরি হবে।”

পুঁজিবাজারের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। নতুন সরকার গঠনের পর রাজনৈতিকভাবে ‘এলাইড’ হিসেবে পরিচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ইতিবাচক সাড়া তৈরি হয়। অনেক বিনিয়োগকারী সম্ভাব্য নীতিগত সুবিধার প্রত্যাশায় ট্রেডিংয়ে অংশ নেন। তবে এ সময়েও বাজারে কারসাজি বা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর প্রচেষ্টা পুরোপুরি থেমে ছিল না। বিশেষ করে জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক লিমিটেড (আইএসএনএল), বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি, রহিমা ফুড কর্পোরেশন লিমিটেড, ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেড, কে অ্যান্ড কিউ (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলস লিমিটেড—এর মতো কোম্পানির ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স দুর্বল থাকা সত্ত্বেও শেয়ারের দাম বেড়েছে। যদি বাজারে প্রকৃত অর্থে তারল্য সংকট তীব্র হতো, তবে এমন মূল্যবৃদ্ধি সম্ভব হতো না। এতে ধারণা জোরদার হয়েছে—বাজারে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ সক্রিয়ভাবে লেনদেন করছে, আরেকটি গ্রুপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সাইডলাইনে রয়েছে।”

পুঁজিবাজারের চ্যালেঞ্জ উত্তরণের পথ ও টেকসই বাজার গড়তে অধ্যাপক আল-আমিনের বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। পাঠকদের উদ্দেশে তা তুলে ধরা হলো-

স্বাধীন বিএসইসি
বিএসইসিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত হতে হবে। শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং অপারেশনাল ও পলিসিগত পরিবর্তন জরুরি। সরকারকে শুধু জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, কাজে হস্তক্ষেপ নয়।

ভালো কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তি
লাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে হবে। এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে সমন্বয় করে দ্রুত নীতিগত ও কর-প্রণোদনা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে ভালো ভালো লাভজনক কোম্পানি পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে হবে।

বন্ড ও সুকুক মার্কেটের উন্নয়ন
ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা ও খেলাপি ঋণ (এনপিএল) কমাতে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাই ব্যাংকের ওপর থেকে ঋণের চাপ কমাতে বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে হবে। মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করলে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে।

পেনশন ও ইন্সুরেন্স ফান্ড আনা
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে পেনশন ফান্ড ও ইন্সুরেন্স ফান্ডকে নীতিমালার মাধ্যমে বাজারে নিয়ে আসতে হবে।

মিউচুয়াল ফান্ড ও স্টার্টআপ কোম্পানির বিকাশ
মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে শক্তিশালী করতে হবে। এখানে প্রফেশনাল অ্যানালিস্টদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আর স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোকে এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তির সুযোগ দিয়ে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।

প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় ‘আনএডিটেবল' ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার নিশ্চিত করতে হবে যাতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো গ্রাহকের ফান্ড আত্মসাৎ করতে না পারে।

বিনিয়োগ শিক্ষা ও মানসিকতা পরিবর্তন
বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। বিনিয়োগকারী যদি শিক্ষিত ও সচেতন না হয় তাহলে সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। অল্পদিনেই মুনাফা করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জের বিকাশ
এজন্য একটা রুলস রয়েছে। তবে এ মার্কেটের জন্য সহায়ক পরিবেশ ও অবকাঠামো প্রয়োজন। শুধুমাত্র আইন কানুন প্রণয়ন করে কমোডিটি এক্সচেঞ্জের সুফল পাওয়া যাবে না।

ঢাকা/এনটি/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়