ঢাকা     বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৮ ১৪২৭ ||  ০৫ সফর ১৪৪২

বাংলা ভাষার অসামান্য গ্রন্থ ‘যদ্যপি আমার গুরু’

আরাফাত শাহীন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২৪, ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
বাংলা ভাষার অসামান্য গ্রন্থ ‘যদ্যপি আমার গুরু’

লেখক আহমদ ছফার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটি পাঠের মাধ্যমে। বছর দুয়েক আগে বইটি প্রথম পড়ি। আমি সাধারণত কোনো বই একবার পড়া হলে দ্বিতীয়বার ধরি না। তা সেটা যত ভালো বই হোক না কেন। কিন্তু যদ্যপি আমার গুরু আমাকে সেই চিন্তা থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। বইটি আবার পড়ে শেষ করলাম। এটি এমনই একটি বই যা বারবার পড়লেও পড়ার তৃষ্ণা মিটবে বলে মনে হয় না।

প্রথমবার যদ্যপি আমার গুরু পড়ে এতটাই ভালো লেগেছিল যে আহমদ ছফাকে বিস্তারিতভাবে জানার জন্য তার অনেকগুলো বই পরপর পড়ে ফেলি। তখনই আমি বাংলা ভাষায় একজন শক্তিমান গদ্যকারের সন্ধান পাই। বস্তুত আহমদ ছফার চিন্তা ও প্রজ্ঞা আমাদের বিস্মিত করে। সম্ভবত যদ্যপি আমার গুরু বইটি আহমদ ছফার সবচেয়ে আলোচিত বই। এই বইটি পড়ার আগে আমি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিলাম। অথচ তিনি ছিলেন আমাদের জাতির অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আহমদ ছফা এই মনীষীকে জাতির সামনে উপস্থাপন করে জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছে বলেই মনে করি।

যদ্যপি আমার গুরু বইটি অধ্যাপক রাজ্জাকের সঙ্গে আহমদ ছফার কথাবার্তার নির্যাস। তবে একে শুধুমাত্র সাক্ষাৎকারধর্মী রচনা বললে ভুল হবে। আহমদ ছফার ভাষায়- ‘আমার এ রচনাটিকে কেউ যদি নিছক সাক্ষাৎকারধর্মী রচনা মনে করেন, আমার ধারণা, লেখাটির উপর কিঞ্চিৎ অবিচার করা হবে।’ অনেক বছর গবেষণা করার সূত্র ধরে ছফা অধ্যাপক রাজ্জাকের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। ফলে এই বইটির পরতে পরতে রাজ্জাক স্যারের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

“যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায়
তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়।”

এই লাইনদুটি দিয়ে লেখা আরম্ভ হয়েছে। আমরা দেখেছি, অধ্যাপক রাজ্জাক ব্যক্তিগতভাবে মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। অপরদিকে তার শিষ্য আহমদ ছফা ছিলেন বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তাধারার সমর্থক। কিন্তু তাদের চিন্তার এই বৈপরীত্য তাদের ব্যক্তিক জীবনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গুরু-শিষ্যের এই সম্পর্ক বহাল তবিয়তে বজায় ছিল। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির একটা স্কলারশিপ পেয়ে গবেষণা সুপারভাইজার হিসেবে বন্ধুদের সহায়তায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে খুঁজে পান আহমদ ছফা। এর আগে তিনি তাকে চিনতেনই না। আহমদ ছফা লিখেছেন- ‘প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের একটি। দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণে, নিষ্কাম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করে নিজের বিশ্বাসের প্রতি স্থিত থাকার ব্যাপারে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের মতো আমাকে অন্য কোনো জীবীত বা মৃত মানুষ অতোটা প্রভাবিত করতে পারেনি।’

আহমদ ছফার লেখা এমনিতেই আমি দারুণভাবে পছন্দ করি। কারণ, তার বক্তব্যে একটা ঋজুতা আছে। তার বইগুলোর মধ্যে যদ্যপি আমার গুরু বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। প্রথমবার একটানে শেষ করে গেলেও এবার আমি বেশ ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে পড়েছি। ফলে আমার একজন প্রিয় শিক্ষকের বলা ‘চলন্ত বিশ্বকোষ’ শব্দটাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। বইটি পড়লে আর কিছু না হোক- অন্তত কয়েক ডজন বইয়ের নাম এবং লেখকের নাম জানা যাবে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বৃটেনে পড়ার সময় প্রথিতযশা অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির ছাত্র ছিলেন। যদিও লাস্কির মৃত্যুর পর তিনি পিএইচডি শেষ না করে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তবুও আমরা দেখবো তার মতো পণ্ডিত ব্যক্তি এই বাংলায় খুব কমই ছিলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভেতর থেকে তিনি জ্বালানি সরবরাহ করতেন। সবচেয়ে আফসোসের বিষয় হলো, তিনি নিজে কিছু লিখে যাননি। এই কাজটি করলে হয়ত তার সম্পর্কে ধারণাটা আরেকটু স্বচ্ছ হতো।

আমাকে যখন কেউ প্রিয় বই অথবা কোন বইটি পড়া উচিত এমন প্রশ্ন করে তখন আমি চোখ বুঁজে যদ্যপি আমার গুরু বইটির কথা বলে দিই। বইটি আমার চিন্তার জগতে বিরাট একটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এই বইয়ের প্রতিটি লাইন আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে; আপনার চিন্তাধারায় সংযোজন করবে নতুনত্ব। যদ্যপি আমার গুরু পড়ার সময় আমরা যে শুধু প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কেই জানবো এমনটা নয়। খুব বেশি বড় সাইজের বই না হলেও এখানে সমসাময়িক অনেক ব্যক্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে এবং প্রফেসর রাজ্জাক তাদের সম্পর্কে কেমন ধারণা রাখতেন সেটাও জানা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান কীভাবে আজ বাংলার বুকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন অল্প হলেও তার একটা ধারণা আমরা এখানে পাবো।

বই: যদ্যপি আমার গুরু
লেখক: আহমদ ছফা
প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১০
মূল্য: ১৭৫/-

 

ঢাকা/মাহফুজ/মাহি 

রাইজিংবিডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়