ঢাকা     রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২৩ ১৪৩২ || ১৭ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

‘লাইনে দাঁড়িয়ে কাটছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আয় করব কখন’

রায়হান হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৯, ৫ এপ্রিল ২০২৬  
‘লাইনে দাঁড়িয়ে কাটছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আয় করব কখন’

জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ছবি: রাইজিংবিডি

লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না জ্বালানি তেল। এতে পেট্রোল পাম্পের সামনে সময় কাটাতে গিয়ে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল চালক ও শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। কর্মঘণ্টার বড় অংশ নষ্ট হওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে, আর সংকট কবে কাটবে, সেই নিশ্চয়তাও দিতে পারছে না কেউ। ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে এমন হতাশা ও ক্ষোভের কথাই জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

রবিবার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকে তেজগাঁও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে লাইন তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম। 

আরো পড়ুন:

তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমি সকাল থেকে অপেক্ষা করছি তেলের জন্য, এখন বেলা ১১টা বাজে তেল পাইনি। আমার দোকানে কর্মচারী রেখে এসেছি। সবার সময়ের একটি মূল্য আছে। এই যে পাম্পে দীর্ঘ লাইন, দীর্ঘ সময় এটা কিন্তু আমাদের জাতীয় অর্থনীতিদের প্রভাব ফেলবে। এই সংকটের শেষ কোথায় সেটা আমরা জানি না।”

শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে অপেক্ষা করছিলেন অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালক রিফাত হোসেন। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমাদের তো দিন আনা দিন খাওয়া। তেলের লাইনে যদি ৩-৪ ঘণ্টা বসে থাকি,  তবে আয় করব কখন আর বউ-বাচ্চার মুখে খাবার দেব কী করে?  গত তিনটি পাম্প ঘুরে এখানে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। জানিনা কখন তেল পাব।”

দিন দিন পাম্পে লাইনের সাড়ি দীর্ঘ হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, “এই সংকট কবে শেষ হবে সেটা কেউই বলতে পারছে না। তবে এখন পর্যন্ত সরকারকে ধন্যবাদ দেওয়া যায় যে তারা তেলের দাম বাড়ানি।”

ঢাকার সড়কগুলোতে এখন চিরচেনা যানজটের চেয়েও এখন ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে পেট্রোল পাম্পের সামনের দীর্ঘ লাইন। গত কয়েক দিন ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ভারী যানবাহন সবই এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে পাম্পের লাইনে। 

নীলক্ষেত, শাহবাগ, রমনা ও তেজগাঁওসহ গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোল পাম্প গুলোতে ঘুরে দেখা যায় ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন। কেউ কেউ তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছে না। করতে হচ্ছে আরো অপেক্ষা।

রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ের পথের ‌বন্ধু ফিলিং স্টেশনের দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। নীলক্ষেত থেকে এই লাইন প্রায় পলাশী মোড় পৌঁছে গিয়েছে। তেলের জন্য এই লাইনে অপেক্ষা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে আবাসিক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের। 

তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমার বাইকের ট্যাংকি একেবারে খালি। তাই বাইক ঠেলতে ঠেলতে এনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দুই ঘন্টা ধরে অপেক্ষায় আছি লাইনে। আজকের যত সময়ই লাগুক তেল নিতে হবে। এই লাইনে আমাদের সবার মূল্যবান সময় আটকে আছে। এই সংকট কবে শেষ হবে সেটি কারো জানা নেই। মার্কিন-ইরান যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী এই জ্বালানি সংকট শেষ হবে বলে মনে হয় না। এই সংকট যে শুধু আমাদের দেশে এমনটা না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, তাই অযথা সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র রয়েছে যারা মজুদ করছে অথবা প্রয়োজনে তুলনায় বেশি নিচ্ছে। তাদের প্রতি সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

একই পাম্পে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রাইভেটকার চালক আব্দুল মালেক।

তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমার মালিকের বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে এসে তেলের জন্য অপেক্ষা করছি। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে লাইনে আছি, কিন্তু এখনো সামনে যেতে পারিনি। বাচ্চার স্কুল ছুটি হওয়ার আগে তেল নিয়ে যেতে পারবো কিনা তাই ভাবছি। এই লাইনে থাকা একটি যুদ্ধের সমান। এই সংকটের শেষ কোথায়? সাধারণ মানুষের সময়ের কি কোনো দাম নেই?”

ওই পাম্পের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমরা লাইন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। আর মানুষের ঝগড়া দেখতে দেখতে ক্লান্ত। এই পাম্পে সব সময় তেল থাকতো। কিন্তু এখন বাড়তি চাপের জন্য নির্ধারিত সময়ের আগে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে প্রয়োজনে তুলনায় বেশি নিতে যাচ্ছে, আমাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করে। তবে আমরা সরকারের নিয়ম অনুযায়ী দিচ্ছি।”

শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষক এম এ মান্নান মজুমদার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমরা ডিলারদের টাকা দিয়ে বসে আছি, কিন্তু তেল পাচ্ছি চাহিদার তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ। প্রতিদিন যেখানে ১০ হাজার লিটার লাগত, সেখানে পাচ্ছি ২ হাজার লিটার। মানুষকে বুঝিয়ে শান্ত রাখা যাচ্ছে না। মানুষকে ‘না’ বলতে বলতে আমাদের মুখ শুকিয়ে গেছে। পুলিশ এসে মাঝে মাঝে ভিড় সামলায়, কিন্তু তেল তো আর পুলিশ দিতে পারবে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই ভিড় কমানো অসম্ভব।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “জ্বালানি তেলের সমস্যা শুধু বাংলাদেশ না, মার্কিন-ইরান যুদ্ধের  কারণে এটা এখন বিশ্বব্যাপী সমস্যা। তবে আমাদের এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে এই সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজিটাল কিউআর কোড সিস্টেম চালু করেছে। যাতে করে কেউ নিয়মের বাহিরে গিয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করে না পারে বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও যদি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা যায় তাহলে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে। এখন যে সরকার জ্বালানি কার্ড চালু করছে তা অনেকে নকল করতে পারবে। এর থেকে সবচেয়ে ভালো হয় ডিজিটাল কিউআর কোড সিস্টেম চালু করা, তাহলে কেউ বাড়তি নিতে পারবে না। আর জ্বালানি তেলের এই সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতিকে ধীর করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময় এবং রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।”

ঢাকা/ইভা 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়