জনপ্রিয় জারার দিকে নজর সবার, জয়ের আশা হাবিবের
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
ডা. তাসনিম জারা ও হাবিবুর রশিদ হাবিব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকা-৯ আসন এবার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী না থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রে আছেন দুজন পরিচিত মুখ। নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল, স্বচ্ছতা এবং পরিচ্ছন্ন প্রচারণার মাধ্যমে তারা ভোটের মাঠে আলাদা বার্তা দিয়েছেন।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব এবং এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া ডা. তাসনিম জারাকে ঘিরেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবর্তিত হচ্ছে। যদিও এ আসনে আরো ১০ জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকার ভোটারদের আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছেন এই দুজনই।
‘এলাকার সন্তান’ হাবিবুর
রাজধানীর পূর্ব মাদারটেক এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হাবিবুর রশিদ হাবিব। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই ব্যবসায়ী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষ নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়। দলের আস্থাভাজন নেতা হিসেবে এবার তিনি ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন।
মনোনয়ন ঘোষণার আগে এই আসনে প্রচারে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আফরোজা আব্বাস। তবে মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে দল হাবিবুরের ওপর আস্থা রাখে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, “তার মনোনয়নে কর্মীরা সন্তুষ্ট এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এজন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তারা।”
ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এই নেতা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন—দল সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করেছে বলেও জানান তারা।
বাসাবো তরুণ সংঘ মাঠে জনসংযোগকালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান হাবিবুরকে ‘এলাকার সন্তান’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন,“এলাকার উন্নয়ন করতে হলে এমন একজন প্রতিনিধিই প্রয়োজন, যিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন। যার বেড়ে ওঠা এই এলাকায়, মানুষের সঙ্গে যার প্রতিদিনের সম্পর্ক—একমাত্র তার পক্ষেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। হাবিব তেমনই একজন। আপনারা তাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।”
‘ঘরের মেয়ে’ তাসনিম জারা
অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী ডা. তাসনিম জারা নিজেকে দাবি করেন ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবে। যদিও তার এই দাবিকে ঘিরে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী তার ভোটকেন্দ্র ঢাকা-১১ আসনের অন্তর্ভুক্ত। তবে এ বিষয়ে অনলাইনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে কাগজে-কলমে তার বাসা ঢাকা-১১ তে পড়েছে, কিন্তু তার বেড়ে ওঠা খিলগাঁও ঝিলপাড় এলাকায়। জীবনের প্রথম ২৩ বছর তিনি এই এলাকায় কাটিয়েছেন। তাই ‘নাড়ির টান’ থেকেই ঢাকা-৯ আসন বেছে নিয়েছেন।”
পেশায় চিকিৎসক, গবেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার তাসনিম জারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজ ভাষায় উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। শুরুতে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।
মনোনয়ন পেতে তাকে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়েছিল—যার জন্য হাতে ছিল মাত্র তিন দিন। সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে তিনি ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। মনোনয়ন বাতিল হওয়া ও আপিলের মাধ্যমে তা ফিরে পাওয়ার ঘটনাও ছিল আলোচিত।
ইতিবাচক প্রচারে ভিন্ন বার্তা
নির্বাচনি প্রচারে দুজনই দেখিয়েছেন ভিন্নতা। তাসনিম জারা ‘শব্দদূষণহীন প্রচারণা’ চালিয়ে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে কোনো কটূক্তি না করে বরং সম্মানজনক অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, তিনি মানুষের কথা শুনেছেন এবং নেতিবাচক প্রচার থেকে দূরে থেকেছেন।
একইভাবে হাবিবুরও প্রতিদ্বন্দ্বীকে ‘সহকর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক পডকাস্টে তিনি বলেন,“আমরা একই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে চাই ঢাকা-৯ আসনের মানুষের উন্নয়ন। আমাদের আদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য তো এক। তাহলে আমরা কেন প্রতিপক্ষ? আমরা সহকর্মী।”
এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
সব মিলিয়ে ঢাকা-৯ আসনে এবার ‘এলাকার সন্তান’ বনাম ‘ঘরের মেয়ে’—এই আখ্যানেই গড়ে উঠেছে নির্বাচনি লড়াই। পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে প্রচার চালানোর যে উদাহরণ তারা স্থাপন করেছেন, তা ইতোমধ্যেই ভোটারদের দৃষ্টি কেড়েছে।
খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানা নিয়ে (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত) এই আসনটি একটি জনবহুল ও মিশ্র আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা। এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৩ জন পুরুষ, ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন নারী ও ৫ জন হিজড়া।
ঢাকা/ইয়াসিন/সাইফ