ঢাকা     শুক্রবার   ২৭ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১৪ ১৪৩২ || ৭ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রম্যগদ্য

নাই, রস নাই

আহমাদ মাযহার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:১২, ২৭ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৬:১৭, ২৭ মার্চ ২০২৬
নাই, রস নাই

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা’! তার মানে কি বাংলাদেশে এখন চলছে এমন দারুণ দহন বেলা যে, এখানে আর হাস্যরসের চর্চা হয় না! বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’ ধারার রচনা, কিংবা পরশুরামের অনন্যসাধারণ হাস্যরস, অথবা শিবরাম চক্রবর্তীর যমকালঙ্কার সমৃদ্ধ কৌতুকী, আবুল মনসুর আহমদের বাংলার মুসলিম সামাজ মানসের অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘটিবাঙাল বৈপরীত্য, রূপদর্শীর অসঙ্গতি নির্ণায়কতা, সৈয়দ মুজতবা আলীর বৈদগ্ধ্যঋদ্ধ হাস্যরসের ধারাটি পশ্চিমবঙ্গে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত কিছুটা তবু নব্বইয়ের দশক অবধি প্রবাহিত হয়েছিল। বাংলাদেশে এই কিছুদিন আগেও আবদুশ শাকুরের পাণ্ডিত্যপূর্ণ হাস্যরস যে উচ্চতায় উঠেছিল তার পথ ধরে তেমন কেউ আর সাফল্য লাভ করেননি। 

শিশুসাহিত্যের গদ্যে জসীমউদ্‌দীন, গোলাম রহমান, নিয়ামত হোসেন, খান মোহাম্মদ ফারাবীর মতো দুয়েকজন কিছুটা তরঙ্গ তুললেও কালক্রমে তার চিহ্ন যেন বিলীন হয়ে গেছে। শিশুসাহিত্যের পদ্যেও কি খুব আছে বলা যাবে? যোগীন্দ্রনাথ সরকার, সুকুমার রায়, সুনির্মল বসুদের ধরায় কতই-বা লেখা হয়েছে! বাংলাদেশে নিয়ামত হোসেন, সুকুমার বড়ুয়া, কার্টুনিস্ট-লেখক আহসান হাবীব, হাস্যরসপ্রবল লুৎফর রহমান রিটন, হানিফ সংকেত হয়ে আনজীর লিটন, রোমেন রায়হান বা মৃদুল আহমদরা আঁচড় কাটলেও তাঁদের মধ্যে দুয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া গুণগত মানে উল্লিখিতদের তুল্য সাফল্যের নতুন নতুন উদীয়মনরা না আসায় বাংলাদেশে এর কোনো সুস্পষ্ট ধারা হয়ে উঠতে পারেনি।  

আরো পড়ুন:

বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসের রমণীয়তা না থাকবার প্রশ্নটি আসলে সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের এক গভীর সাংস্কৃতিক আত্মস্মৃতিকেই মনে হয় স্পর্শ করছে। এর পটভূমিতে একটি ধারণা বেশ প্রবল হয়ে আছে যে, কৌতুকপূর্ণ রচনার স্বর্ণযুগ বুঝি শেষ হয়ে গেছে। বাংলা কৌতুকগদ্যের ক্ষেত্রে এমন একটি শক্তিশালী ধারণা এখনো প্রবল যে, এর স্বর্ণযুগ ছিল উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত! এই সময়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের কথা বলা যায়, যথা সুকুমার রায়, রাজশেখর বসু (পরশুরাম), শিবরাম চক্রবর্তী-  এঁরা কৌতুককে কেবল হাসির উপকরণ হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ব্যঙ্গ, সাংস্কৃতিক আত্মসমালোচনা ও ভাষার খেলার এক উচ্চতর শিল্পে উন্নীত করেছিলেন। বিশেষত সুকুমার রায়ের রচনায় অযৌক্তিকতাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক ও রাজনৈতিক মন্তব্য প্রকাশ করার কৌশলটি ছিল খুবই সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী। এই ঐতিহ্য এতটাই উচ্চমানের ছিল যে, পরবর্তী লেখকেরা এর কাছাকাছিও পৌঁছুতে পারেননি। ফলে তাঁরা হয়ে উঠেছেন হাস্যকৌতুকী রচনার স্মৃতিকাতরতার উৎস। সময়ের অনুষঙ্গকে এমনই তীক্ষ্ণতায় তাঁরা ধারণ করেছিলেন যে, বারবার মনে হয়, নাহ্, ওইরকম আর তো কেউ লিখতে পারছেন না!

সময়ের বদলে এমন হয়েছে যে, সমাজের বৌদ্ধিক আত্মবিশ্বাস যেন কমে গিয়েছে। কৌতুকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিজেকে নিয়েই হাসতে পারার ক্ষমতা। অথচ এখনকার সমাজ অনেক বেশি স্পর্শকাতর, অনেক বেশি যেন আত্মরক্ষামূলক! রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ এতটাই বেড়েছে যে ব্যঙ্গকে সোজাসুজি ‘অপমান’ বা ‘অসম্মান’ হিসেবে নেওয়া হয়। এই অনুভব মান্য করে ব্যঙ্গ করতে গিয়ে লেখকেরা অনেকটা নিজের অজান্তেই আত্মনিয়ন্ত্রণ করে ফেলন। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সমাজের মানুষ ব্যঙ্গের মাধ্যমে নিজের অসঙ্গতি নিয়ে হাসতে পারত। সন্দেহ নেই যে, এটি ছিল বাঙালির একটি সাংস্কৃতিক শক্তি। এখন সেই আত্মবিশ্বাস ধারণ করার মতো ব্যক্তিসত্তা কমে গেছে এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়।

আরেকটা কথা কিন্তু উঠতে শুরু করেছে। সেটা হলো হাস্যকৌতুকের ভাষামাধ্যমই বদলে গেছে। মুদ্রণমাধ্যম থেকে যেন ডিজিটাল মাধ্যমে রপ্তানি হয়ে গেছে তা। সম্ভবত বর্তমানের হাস্যকৌতুক সৃষ্টির বিষয়ে এটিই এখনকার সবচেয়ে বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। আগে কৌতুকগদ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল ছোটগল্প, ব্যক্তিগত-প্রবন্ধ অথবা পত্রিকার কলাম। এখন তা স্থানান্তরিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এখন তা চলে গেছে ফেসবুক স্ট্যাটাস, মিম-সংস্কৃতি, স্ট্যান্ডআপ কমেডি কিংবা ইউটিউব স্কেচে! সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ওলটপালটের সময় আমরা বোধ হয় সবচেয়ে প্রবলভাবে তা অনুভব করেছি।

কৌতুকগদ্যও নিশ্চয় বিলুপ্ত হয়নি। বরং বলতে পারি, হয়তো বিশিষ্ট এই সাহিত্যিক রূপটি তার ধার হারিয়েছে। এমন বলতে পারি যে, আমাদের হাস্যকৌতুকীর সাংস্কৃতিক রূপের আঙ্গিক বদলে গেছে; ইংরেজি ‘ফর্ম-শিফট’ কথাটি বোধহয় বেশি অর্থজ্ঞাপক হয় এ প্রসঙ্গে। অর্থাৎ বিষয়টির মৃত্যু ঘটেনি, আঙ্গিকের রূপান্তর ঘটেছে মাত্র!

সাধারণ অর্থেই সাহিত্য সম্ভবত এখন বেশি গুরুগম্ভীর হয়ে উঠেছে বলে মনে করা যায়। সামগ্রিক বিবেচনায় এসথেটিকসের ধারণা এখন বদলে গেছে। বাংলা সৌন্দর্যতত্ত্ব কথাটি এখানে আমার ধারণাটি প্রকাশ করতে পারছে না বলে ইংরেজি এসথেটিকস শব্দটিই ব্যবহার করলাম। কারণ, আধুনিকতর বাংলা সাহিত্যে এখন প্রাধান্য পাচ্ছে আতঙ্কের বোধ, পরিচিতি-রাজনীতির তীব্রতা, অস্তিত্বের উৎকণ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের প্রাবল্য। ফলে হাস্যরসাত্মকতাকে অনেক সময় গাম্ভীর্যপূর্ণ কাজের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখতে অসুবিধা হয়! কৌতুককে শিল্পের ‘ছোট-আঙ্গিক’ বা ‘মাইনর ফর্ম’ হিসেবে দেখাও সম্ভবত এখনকার একটি প্রচলিত ধারণা। যদিও একটি প্রতি-ধারণা এখন প্রবলতর হয়েছে যে, কৌতুক আছে, কিন্তু আমরা তাকে আর স্বীকার করতে চইছি না!

কৌতুকরচনা সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো, সমস্যা যতটা লেখকের অভাব, তার চেয়ে বেশি পাঠকের গ্রহণসামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা! আজকের দিনের কৌতুক ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ঘটনাস্মৃতি নির্ভর বা নির্দিষ্ট মাধ্যমকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় যেন সাহিত্য হিসেবে মান্যতা বা মর্যাদা পাচ্ছে না! অথচ গভীরতর বিশ্লেষণ হচ্ছে: কৌতুক আসলে সামাজিক শক্তিরই লক্ষণ! ইতিহাসে কৌতুক সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছে সেই সময়গুলোতে, যখন সমাজ পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসী আত্মসমালোচনামূলক এবং সাংস্কৃতিকভাবে প্রাণবন্ত থাকে। 

সুকুমার রায় বা পরশুরামের সময়ের বঙ্গসমাজ ঠিক এই অবস্থাতেই ছিল। ঔপনিবেশিকতার চাপে থেকেও স্বজাতির সামগ্রিক সাংস্কৃতিক শক্তির ওপর আস্থা ছিল প্রবল। আমাদের এখনকার সমাজ অনেক বেশি বিচূর্ণিত উৎকণ্ঠ নিজস্ব সাংস্কৃতিকতার প্রতি অনিশ্চয়তা বা আস্থার অভাব। এমন পরিস্থিতিতে কৌতুকের ভাষা বদলে যায়। তবে বাংলা ভাষায় কৌতুকগদ্য আর রচিত হচ্ছে না এমনটিও বলা বোধ হয় ঠিক নয়। কৌতুকহাস্য হয়তো আরো সূক্ষ্ম ও গভীর জীবনবোধকে উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছে। সেই মাত্রার প্রতিভা নেই বলে তা উপলব্ধ হচ্ছে কম। হয়তো বাংলা কৌতুকীর পরিচিত ও মান্য ধারটি অর্থাৎ ‘ক্যাননিক্যাল হিউমার প্রোজ’ কমে গেছে কিন্তু রচিত হচ্ছে বিচ্ছুরিত সূক্ষ্ম রম্যঐশ্বর্য! মনোযোগী রসিক পাঠকের চোখে তা ধরা পড়ছে নিশ্চয়ই। ভালো সমালোচনা-সাহিত্য থাকলে এতদিনে হয়তো এই ধারাটিকেও ভালোভাবে চেনা হয়ে উঠত আমাদের কাছে। তার কিছুটা অনুসন্ধানও হয়তো করা যায়। কিন্তু তাতে এই রচনাটি অন্য দিকে মোড় নেবে। সে অনুসন্ধান না হয় অন্য রচনার জন্য তোলা রইল! 

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়