রম্যগদ্য
মশক নিয়ে রম্যকথন
হাসান হাফিজ || রাইজিংবিডি.কম
মশক নিয়ে জাতি বড়োই দুরবস্থায় নিপতিত। ক্ষুদ্র এই প্রাণীটি (থুক্কু, পতঙ্গটি) যে মিসাইলের চাইতেও ভয়ঙ্কর ও অব্যর্থ, সে কথা কে না জানে। এদের মূল টার্গেট মনুষ্য শরীর, লোহু ছাড়া অন্য কিছু মুখে রোচেই না। ভিকটিমের পৈতৃক প্রাণ শেষ পর্যন্ত টিকল কি টিকল না, সে ব্যাপারে থোড়াই কেয়ার। আমরা মশক সম্প্রদায়, হে মানবকুল কুর্নিশ করো আমাদের। দিবারাত্রি তটস্থ থাকো। আমরা হলাম নির্ভেজাল শোষক, রক্তচোষক। আমাদের অস্তিত্ব জানমাল নস্যাৎ করার যে কূট ষড়যন্ত্রে তোমরা লিপ্ত রয়েছ, হে মানবমণ্ডলী সেটার পরিণতি কিন্তুক ভালো হবে না। কোনোমতেই না। অতএব, সাধু সাবধান!
‘মশক নিধন কর্মসূচির’ নামে (কিংবা বেনামে) কত কর্মকাণ্ড যে চলেছে, তার শুমার করা মুশকিল। তহবিল তছরূপ কিংবা নয়ছয় যাই-ই বলা হোক না কেন, যথেষ্টই হয়েছে। এনাফ ইজ এনাফ। সাম্প্রতিক কানাঘুষা এই- আরো আরো মহা মহা কর্মসূচি নাকি নেওয়া হবে। কী তার লক্ষ্য? না, আমাদের নিকেশ বা নির্মূল করা। ছ্যাঃ। নিকুচি করি এইসব মান্ধাতার আমলের বালখিল্য কর্মসূচির। মশা মারতে কামান দাগার কোশেশ-কসরত তো ইহজনমে কম দেখিনি আমরা (আওয়ার একসিলেন্সি মশা কমিউনিটি)। নতুন কী আর দেখব? কবির ভাষায় বলতে পারি ‘দুঃখের শক্তি নাই দুঃখ দেয় আবার আমারে...।’
মাস মিডিয়ায় অল্প কদিন আগেই চাউর হয়েছে যে নতুন নির্বাচিত সরকার নাকি ১৮০ দিনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। সরকার বাহাদুরের হয়তো একিন নাই যে আমরা সদলবলে সেই ‘হাতেই’ মোক্ষম হুল ফুটিয়ে দিতে সক্ষম। দু’চার হালি কর্তা কিসিমের লোকজনের শইল্যে যদি ডেঙ্গুর বীজ ঢুকিয়ে দিতে পারি, তাহলেই কম্ম সারা। খেইল খতম, পয়সা হজম। কর্তাব্যক্তিরা তখন ১৮০ দিনের প্রোগ্রাম ঝেড়ে টেড়ে ফেলে দিয়ে হাসপাতালের বিছানা নেবে। অতঃপর যমে মানুষে টানাটানি। জান বাঁচলে তো কর্মকৌশল বাস্তবায়ন। ওই যে কথা আছে না- য পলায়তি স জীবতি।
আমরা মশারা, ছোট এতটুকুন পতঙ্গ হলে কী হবে, মানব সমাজে আমাদের প্রভাব প্রতিপত্তি, চোটপাট, হাঁকডাক মোটেও মামুলি না। আমরা বিশ্বাস করি শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থায়। সে কারণেই আমরা কোনো বাছবিচার করি না। নাহ, চাঁদাবাজ-ফতোয়াবাজ, হিরঞ্চি-সুশীল কাউকেই ছেড়ে কথা কই না। এইবার একটুকুনি জ্ঞানচর্চা করা যাক। নাহ, বেশি জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করব না। মশা নিয়া ডিকশনারিতে কী লেখে? বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান ঘেঁটে দেখা যাক। জ্ঞানপিপাসুদের জন্য মশার অর্থ দেওয়া আছে নিম্ন প্রকার :
স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে বিচরণ করে এবং মেরুদণ্ডী প্রাণী রক্ত ফলের রস প্রভৃতি খেয়ে জীবনধারণ করে এমন গোলাকার মাথা লম্বাটে হালকা দেহ এবং ডানাবিশিষ্ট কালচে ধূসর পতঙ্গ (যার স্ত্রীকুল ম্যালেরিয়া গোদ ডেঙ্গু প্রভৃতি মারাত্মক রোগ জীবাণুর সংক্রমণ ঘটায়।) উরে বাপ রে বাপ! কত্ত লম্বা এই ডেফিনেশন। পড়তে পড়তে গলা শুকিয়ে যায় রে বাছা। এই কে আছিস, এই গেলাস পানি নিয়া আয়। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি (না না, আমব্রেলা নয়), ফেটে যাচ্ছে গো!
মশা কীভাবে হত্যা করা যায়? তরিকাসমূহ কী কী এবং কেমন? কয়েল, ধূপ ধনা স্প্রের কথা তো আমরা দাদার কাল থেকেই জানি। হালে অর্গানিক উপায়ের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গুগল মামা বলছেন, লেবু-লবঙ্গ কপুর বা নিমপাতা পোড়ানো, লেমন গ্রাস ও তুলসী গাছ রাখার, চা-পাতা শুকিয়ে ধুনো দেওয়া এবং ঘরে সুগন্ধি ব্যবহার করা খুব কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। এ ছাড়া মশার প্রজনন রোদে বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা এবং জানালায় নেট ব্যবহার করা অপরিহার্য।
এইটা তো গেল গুগল মামার প্রেসক্রিপশন। আমরা আমজনতা কিন্তু মশা নিধনের আগাপাস্তলা বিপক্ষে। এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন (বা প্রকারান্তাে কোনো চক্রান্ত) করা হলে আমরা আন্ডাবাচ্চাসুদ্ধ স্ট্রেইট ‘না’ ভোটের পক্ষে দাঁড়াব। জগতের কোনো শক্তি নাই যে আমাদের এই ধনুর্ভঙ্গ পণ থেকে আমাদের বিরত রাখে। কেন আমরা মশক নিধনের বিরুদ্ধে থাকতে চাই? তার যৌক্তিক কারণ সমূহ কী কী? কারণ আছে কারণ, বলতে যে নাই বারণ।
১. কয়েল, স্প্রে, লোশন শিল্প যে বিকশিত হয়ে চলেছে, তা খর্ব করা চলবে না। দেশ, সমাজ, সিটিসমূহ, গ্রামগঞ্জ যদি সত্যিকার অর্থেই মশকমুক্ত হয়ে যায় (এমনটা এই জিন্দেগিতে হবে না, এই আশা তো আমরা করবই) তাহলে বহু লোক বেকার হয়ে যাবেন। দেশের মাইক্রো ম্যাক্রো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি রসাতলে যাবে। এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।
২. মশারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে নতুন ঝুট ঝামেলা সংকটের উদ্ভব হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। সেখানেও বেকারত্বের হাতছানি। নো, নো। এইটা হতে পারে না। ঘরে ঘরে স্বামী-স্ত্রী, ভাই বোন, আওলাদ ফরজন্দের মধ্যে নিত্য ক্যাচাল ও মন কালাকালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে সেইটে হয়, মশারিখান কে টাঙাবে, তা নিয়ে।
৩. মশার ওষুধ কেনা নিয়ে দুর্নীতি, মালপানি লুটপাটের যে মহা সংস্কৃতি (পড়ুন অপসংস্কৃতি) গড়ে উঠেছে, তার মূল উৎপাটন করতে দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। চলবে না চলবে না। আমরা চাই স্থিতাবস্থা। যেমন চলছে চলুক না। লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন! পাবলিক ইন্টারস্টের গুল্লি মারি! হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা বলে কতো মেয়র/ প্রশাসক এল গেল-কিসসুটি কেউ করতে পারেন নাই। কার কতটুকু হ্যাডম, শক্তিমান মশক সম্প্রদায় সেটা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছে- প্রয়োজনে আরো অসংখ্যবার করবে। কুছ পরোয়া নেহি।
পাদটীকা : স্পেস সীমিত। সেই কারণে এ রচনা আর দীর্ঘ করা মোটেও সমীচীন হবে না বাহে। ভবিষ্যতে এ নিয়ে একখান পিএইচডি থিসিস (বাংলায় বলে অভিসন্দর্ভ) লিখবার বাসনা রইল। এলাহি ভরসা।
ঢাকা/তারা//
২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামে এল ‘পিভিটি সোলানা’