বিনিরাইল মাছের মেলায় একদিনে কোটি টাকার লেনদেন
রফিক সরকার, গাজীপুর || রাইজিংবিডি.কম
জামাই মেলায় বিশালাকৃতির কাতল মাছ উঁচিয়ে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন বিক্রেতা।
আড়াইশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে পৌষ সংক্রান্তির রেশ কাটিয়ে মাঘ মাসের প্রথম দিনে বসে এক ব্যতিক্রমী লোকজ উৎসব বিনিরাইলের মাছের মেলা। একদিনের এই আয়োজন শুধু মাছ কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ সমাজের আত্মীয়তা, পারিবারিক সম্পর্ক ও বাঙালি কৃষ্টির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন মাছের মেলা নয় বরং পরিচিত জামাই মেলা নামে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ভোর থেকেই বিনিরাইল গ্রামের সংলগ্ন বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে জমে ওঠে উৎসবের আমেজ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মানুষের ঢল, কেনাবেচা আর আনন্দ-উল্লাস। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে একদিনেই কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয় বলে জানান আয়োজকরা।
এই মেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য- এখানে প্রধান ক্রেতা জামাইরা। পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বিনিরাইল ও আশপাশের গ্রামগুলোতে শ্বশুরবাড়ির দাওয়াত যেন অলিখিত সামাজিক নিয়ম। জামাইরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে মেলা থেকে বড় আকারের মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে যান।
আবার অনেক শ্বশুরও মেলায় আসেন জামাইকে আপ্যায়নের জন্য সবচেয়ে বড় মাছটি কিনে নিতে। ফলে পুরো মেলাজুড়েই চলে জামাই-শ্বশুরের মধ্যে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা-কে কিনবেন সবচেয়ে বড় মাছ।
প্রায় দুই শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী মেলায় বাহারি মাছের পসরা সাজান। সামুদ্রিক চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালী বাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, ইলিশ, রূপচাঁদা থেকে শুরু করে নানা প্রজাতির দেশি মাছ সবই পাওয়া যায় এখানে। বড় আকৃতির মাছই এই মেলার প্রধান আকর্ষণ।
মাছের পাশাপাশি মেলায় বসে মিষ্টির দোকান, খেলনা, আসবাবপত্র, ফল, আচার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান। প্রতি কেজি মিষ্টি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। শিশুদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের বিনোদনের আয়োজন, যা মেলাটিকে পারিবারিক উৎসবে রূপ দেয়।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে এই মেলার সূচনা। ধান কাটার পর খালি মাঠে স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল মাছের এই হাট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু বাজার নয়, বরং সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজন হিসেবে শুরু হলেও আজ এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রবীণরা বলেন, ঈদ বা পূজায় জামাই শ্বশুরবাড়িতে না এলেও বিনিরাইলের জামাই মেলায় ঠিকই হাজির হন। এটি এখন এক ধরনের সামাজিক রেওয়াজ।
কালীগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় চুপাইর গ্রামের জামাই মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, “এ মেলায় প্রতি বছরই আসি। এটি এখন শুধু ধর্মীয় বা পারিবারিক আয়োজন নয় সব মানুষের উৎসব।”
মেলায় ঘুরতে আসা শহিদুল সরকার বলেন, “অনেকদিন ধরে মেলাটি দেখার ইচ্ছা ছিল। বন্ধুর শ্বশুরবাড়ির দাওয়াতে এসে মেলার আনন্দ উপভোগ করছি।”
স্থানীয় যুবক আলামিন সুমনের ভাষায়, “কর্মব্যস্ততার মাঝেও এই মেলায় না এলে মনটা ভরে না। এটা আমাদের শিকড়ের টান।”
মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, ঐতিহ্যের টানে তারা বড় বড় আড়ৎ থেকে মাছ এনে মেলায় বসেন। এখন বেচাকেনার পাশাপাশি মানুষের ভিড় ও উৎসবের আবহই এই মেলার বড় শক্তি।
বিনিরাইল মাছের মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বলেন, “এই মেলা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। একদিনেই কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়।”
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন জানান, মেলাকে ঘিরে থানা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.টি.এম. কামরুল ইসলাম বলেন, “বিনিরাইলের মাছের মেলা গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ধরনের আয়োজন আমাদের চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতিকেই তুলে ধরে।”
সব মিলিয়ে বিনিরাইলের জামাই মেলা কেবল একটি বাজার নয়-এটি গ্রামীণ সমাজের সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন ও বাঙালি কৃষ্টির এক জীবন্ত প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনেও যে ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি, বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে—তারই প্রমাণ এই মেলা।
ঢাকা/এস