তামাক অধ্যাদেশের টানাপোড়েন, অনুমোদিত ধারার পুনর্বিবেচনা
রুবেল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম
তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীদের ক্রমবর্ধমান দাবির মুখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গত বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ই-সিগারেট বা ইএনডিএস আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল।
পরে ২৩ ডিসেম্বর অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয়। একইসঙ্গে তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত করার পাশাপাশি ইএনডিএস এবং অন্যান্য নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়।
অধ্যাদেশের ৬ (গ) ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম, এর যন্ত্রাংশ বা অংশ বিশেষ (ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ভ্যাপিং, ব্যাপার ও ই-লিকুইড ইত্যাদি), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস বা ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টস যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, প্রচার-প্রচারণা, প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিপণন, বিতরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন করবেন না বা করাবেন না।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংশোধন করতে যাচ্ছে। এই পদক্ষেপটি জনস্বাস্থ্যের উদ্দেশ্য থেকে সরে আসার ইঙ্গিত নয় বরং আইনটিকে কীভাবে প্রমাণভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য করা যায় তার পুনর্মূল্যায়নকে প্রতিফলিত করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অনুমোদনের পর থেকেই এই অধ্যাদেশটি বিভিন্ন মহলে- ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পগোষ্ঠী, কৃষক, পরিবেশক ও নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকেই অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের ঘাটতি এবং বিদ্যমান বাজার বাস্তবতায় কিছু ধারার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বিশেষজ্ঞরা বারবার উল্লেখ করেছেন যে শৃঙ্খল সরবরাহ, খুচরা বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং আইন প্রয়োগের উপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই অধ্যাদেশটি প্রবর্তন করা হয়েছিল। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছিল, এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে বাজারের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং নিয়ম পালনে প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে অধ্যাদেশটি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তকে একটি বাস্তবসম্মত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা প্রশাসনিক সক্ষমতা, বাজারের বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতির সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।
বাংলাদেশের তামাক বাজারে কিছু স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মোট সিগারেট বাজারের ১৩ শতাংশেরও বেশি অবৈধ পণ্যের দখলে। এ ধরনের বাস্তবতায় খুচরা দোকানে প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর প্রয়োগনির্ভর পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি বহন করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, এই ধরনের পদক্ষেপ বৈধ বিক্রিকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং বাজারগুলোতে অবৈধ নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করতে পারে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সতর্ক করেছে যে একই সাথে প্রয়োগ ব্যবস্থা জোরদার না করে নিয়ন্ত্রিত পণ্যের দৃশ্যমানতা সরিয়ে নিলে তা চাহিদাকে আরো বেশি করে অনিয়ন্ত্রিত বিকল্পগুলোর দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য এবং রাজস্ব উভয় লক্ষ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ব্যবসায়ী সংগঠন, কৃষক, পরিবেশক থেকে শুরু করে নীতি বিশেষজ্ঞদের কেউই তাই অবাক হননি যখন অধ্যাদেশটি পুর্নর্বিবেচনার জন্য সংসদীয় কমিটি সিদ্ধান্ত দিল। বরং অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন যে হুজুগে করা কোন নীতি দিয়ে বাংলাদেশ চলবে না। বাংলাদেশে সিগারেটের ব্যবসা শুধু ব্যবসা নয়, এটা ভূগোল, সমাজতত্ত্ব ও বাজারশাস্ত্রের মিশ্রণ। গবেষণা বলছে, দেশের সিগারেটের বাজারের প্রায় ১৩ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে।অর্থাৎ আপনি যতই নিয়ম করুন, যদি সেই নিয়ম হাজারো খুচরা দোকানে একইভাবে কার্যকর না হয়, মানুষ সরে যাবে সস্তা অবৈধর দিকেই।
এ অবস্থায় খুচরা দোকানে বৈধ পণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা মানে হলো দুধ-ভাত দিয়ে কালসাপ পোষা যা ফিরে আমাকেই দংশাবে। অসাধু ব্যবসা খমতায়নে কেন আমরা এত সোচ্চার তা উদ্বেগের। যারা বৈধ পণ্য আড়ালে ঢুকিয়ে রাখার ওপর জোর দেন, তারা হয়তো জানেন না দেশের বহু জায়গায় অবৈধ সিগারেট অনেক আগে থেকেই আড়ালে, আক্ষরিক অর্থেই অবৈধভাবে বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে তামাক নিয়ন্ত্রণে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। দণ্ড বৃদ্ধি, ব্যবহারের ক্ষেত্র সংকুচিত করা, বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এর অন্যতম। এ কারণে এই অধ্যাদেশ পুনর্বিবেচনাকে নেতিবাচক ভাবলে ভুল হবে। বরং এটা এক ধরনের নীতি সংস্কার। স্বাস্থ্য সুরক্ষা থাকবে, কিন্তু আইনও হবে বাস্তবসম্মত, আলোচনাভিত্তিক এবং কার্যকরযোগ্য।
তামাক নিয়ন্ত্রণ একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য ইস্যু, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু আইন যদি বাজার বাস্তবতা, খুচরা বাজারের জটিলতা, এবং অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকি না জেনে তৈরি হয়, তাহলে নীতি উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। সরকারের নতুন উদ্যোগ তাই অন্য কিছুর চেয়ে বেশি স্মরণ করিয়ে দেয়, ভালো নীতি কেবল কঠোর নয়, হতে হয় বাস্তবসম্মত।
ঢাকা/তারা//
আদানির সঙ্গে চুক্তি সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনাধীন: জ্বালানিমন্ত্রী