ঢাকা     শুক্রবার   ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ৩ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

চিরকুটকে আমন্ত্রণ, বিতর্কে ডাকসু

ঢাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৮:২২, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
চিরকুটকে আমন্ত্রণ, বিতর্কে ডাকসু

বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (২০১৩ সাল) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চে ‘তুই রাজাকার’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে বিচার নয়, সরাসরি ফাঁসির দাবিকে জনপ্রিয় করার অভিযোগ রয়েছে যে ব্যান্ড চিরকুটের বিরুদ্ধে—তাদেরই আসন্ন কনসার্টে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে ক্যাম্পাসে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ডাকসু ও ‘স্পিরিট অফ জুলাই’ এর যৌথ আয়োজনে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম যখন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগে সমালোচিত হচ্ছিল, তখন কিছু সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বিচার প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ‘ফাঁসি চাই’ স্লোগানকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখে।

আরো পড়ুন:

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ সেশনের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন অর রশিদ বলেন, “চিরকুটকে আমন্ত্রণ করার মাধ্যমে মূলত গণজাগরণ মঞ্চের সাংস্কৃতিক অংশীজনের তৎকালীন কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার নামান্তর। যে ব্যান্ড বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল তারা বর্তমানে ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রাম করবে আর এটা শিক্ষার্থীরা মেনে নিবে তা হতে পারে না। চিরকুট আসলে তাদেরকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে।”

সমালোচকদের দাবি, ২০১৩ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রকাশ্য রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময় শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনে বামপন্থি সংগঠন, ছাত্রলীগ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি অংশ ‘বিচার চাই’ এর পরিবর্তে সরাসরি ‘ফাঁসি চাই’ দাবিকে সাংস্কৃতিকভাবে বৈধতা দেয়। চিরকুটের ‘তুই রাজাকার’ এবং অবস্কিওরের ‘দেশ ছাড় রাজাকার’ গান সে সময় রাজনৈতিক বিভাজন আরো তীব্র করে তোলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডাকসুর আয়োজনে চিরকুটকে আমন্ত্রণ জানানোয় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের উল্লেখযোগ্য বিজয়ের পর এমন সিদ্ধান্তকে অনেকে রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন। প্রশ্ন উঠছে; ডাকসু কি পরোক্ষভাবে হাসিনা আমলের বিচারিক হত্যাকাণ্ডের সাংস্কৃতিক বৈধতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে?

ফিরে দেখা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক সমালোচনা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আসামিপক্ষের সাক্ষী হাজিরের সুযোগ না দেওয়া, সাক্ষীদের হয়রানি এবং প্রতিরক্ষার সময়সীমা সংকুচিত করার অভিযোগ তোলে। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে তুলে নেওয়ার ঘটনাও তখন বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।

এর আগে ২০১২ সালের আলোচিত স্কাইপ কেলেঙ্কারিতে বিচারকদের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ ফাঁস হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিচারকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ‘জুডিশিয়াল মার্ডার’-এর ছক কষার অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমালোচকদের মতে, এসব বিতর্কের পরও চিরকুট ওই ধারার গানে সক্রিয় ছিল। শুধু শাহবাগ আন্দোলন নয়, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনেও তাদের গান পরিবেশনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের গানের কথায় বিচারের পরিবর্তে সরাসরি ফাঁসির দাবি উচ্চারিত হওয়ায় সে সময় রাজনৈতিক সহিংসতা আরও উসকে দেওয়া হয়েছে বলেও মত রয়েছে।

এ বিষয়ে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। এটি একটি তথ্যগত ঘাটতি ছিল।”

তিনি জানান, বিষয়টি বর্তমানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই আয়োজনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—ডাকসু কি সাংস্কৃতিক আয়োজনের আড়ালে অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকা ও বিচারিক হত্যাকাণ্ডকে উপেক্ষা করছে, নাকি সচেতনভাবেই সেই ইতিহাসকে আবার বৈধতা দিচ্ছে!

ঢাকা/সৌরভ/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়