লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষে কৃষকের মুখে হাসি
শাহীন গোলদার, সাতক্ষীরা || রাইজিংবিডি.কম
সূর্যমুখী ক্ষেত।
বিশাল মাঠ জুড়ে হলুদের সমারোহ। দূর থেকে দেখে মনে হবে মাটির বুকে হলদে চাদার বিছানো। কিছুটা কাছে গেলেই দেখা মেলে, হাজারো সূর্যমুখী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নয়ন জুড়ানো এ দৃশ্যে সবার মন কাড়ছে। ফলন ভালো হওয়ায় সূর্যমুখীর সঙ্গে হাসছে কৃষকরাও।
কম খরচে অধিক লাভের সম্ভাবনা থাকায় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার লবণাক্ত জমিতে বাড়ছে সূর্যমুখী চাষ। স্বল্প সময়ে এই ফসল উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। হলুদের রূপ দেখতে সূর্যমুখী ক্ষেতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে সাতটি উপজেলায় মোট ২২৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। গত বছর ১০৯ হেক্টর জমিতে এ ফুল আবাদ হয়েছিল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ১১৯ হেক্টর। এর মধ্যে তালায় ৬৩ হেক্টর, শ্যামনগরে ৬০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ৩৪ হেক্টর, সদর উপজেলায় ২৭ হেক্টর, কলারোয়ায় ২২ হেক্টর, আশাশুনিতে ১৫ হেক্টর এবং দেবহাটায় ৭ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী ফসলের চাষ হয়েছে।
তালা উপজেলার খলিশখালি গ্রামের কৃষক সুজয় কুমার দাশ জানান, তার গ্রামের আশপাশের মাঠে গেলে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ হলুদ আভা। দূর থেকে মনে হয় যেন হলুদ গালিচা বিছানো। কাছে গেলে দেখা যায়, সারি সারি সূর্যমুখী ফুল বাতাসে দুলছে। তার মতে, শুধু সৌন্দর্য নয়, এই ফুল এখন আয়েরও বড় উৎস। তার মতে প্রতি কেজি সূর্যমুখী বীজ থেকে অন্তত আধা লিটার তেল উৎপাদন সম্ভাব।
তিনি বলেন, “প্রতি বিঘায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল মিলতে পারে। বর্তমানে প্রতি লিটার সূর্যমুখী তেলের দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় খরচ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকা। তেল ছাড়াও বীজের খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।”
তালা উপজেলার ভারসা গ্রামের কৃষক আকবর হোসেন জানান, সূর্যমুখী চাষের মূল লক্ষ্য তেল উৎপাদন। তার ভাষ্য, প্রতি বিঘা জমিতে সাত থেকে ১০ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। লবণাক্ত জমিতে অন্য ফসল ভালো না হলেও সূর্যমুখী তুলনামূলক ভালো ফলন দিচ্ছে। স্বল্প সেচ ও কম পরিচর্যায় এ ফসল উৎপাদন সম্ভব। তাই কৃষকেরা ঝুঁকছেন এ আবাদে।
জেলার শ্যামনগর উপজেলার কৃষক আবিদুর রহমান পলাশ বলেন, “উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততা দীর্ঘ দিন ধরেই কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই লবণাক্ত পতিত জমিতেই এখন হলুদ রঙের নতুন স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা।”
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মনিরুল ইসলাম বলেন, “সূর্যমুখী একটি সম্ভাবনাময় তেলবীজ ফসল। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মানসম্মত বীজ ও সার সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের ভোজ্যতেলের বড় অংশ আমদা নির্ভর। স্থানীয়ভাবে সূর্যমুখী উৎপাদন বাড়লে আমদানির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।”
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সে প্রেক্ষাপটে বিকল্প তেলবীজ ফসল হিসেবে সূর্যমুখী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে ছোট আকারের তেল নিষ্কাশন যন্ত্র স্থাপন করা গেলে স্থানীয় বাজারে সরাসরি সরবরাহও বাড়ানো সম্ভব।”
তিনি বলেন, “সূর্যমুখীর উৎপাদন বাড়াতে চলতি মৌসুমে ৬০০ কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকে এক কেজি করে টিএসএফ জাতের বীজ এবং দুই ধরনের সার মিলিয়ে ২০ কেজি পেয়েছেন। বীজ ও সার বাবদ মোট ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।” এই প্রণোদনা কৃষকদের উৎসাহিত করেছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা/মাসুদ