বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ
মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টির অনৈতিক সুবিধা, অনুসন্ধানে বিএসইসি
নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর হেফাজতকারী ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত ট্রাস্টি ফি গ্রহণের পাশাপাশি ট্রাস্টি কমিটির সদস্যরা ত্রৈমাসিক সভায় অংশগ্রহণের নামে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা (সম্মানি) নিচ্ছেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।এদিকে অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এরই ধারাবাহিকতায় তদন্তের স্বার্থে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর পরিচালনাকারী সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর কাছে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রাসঙ্গিক, সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছে কমিশন।
সম্প্রতি বিএসইসির ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন থেকে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর পরিচালনাকারী সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, আদেশ জারির পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ সংক্রান্ত সব তথ্য কমিশনে দাখিল করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিগত সরকারের আমলে আইন বা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি হলেন-একটি স্বাধীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যারা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত থাকেন। ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান একটি দলিল (ট্রাস্ট ডিড) অনুযায়ী কাজ করেন। আর নিশ্চিত করেন যে, সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি নিয়মনীতি মেনে বিনিয়োগ করছে, যাতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়। কিন্তু এবার ট্রাস্টির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা।ফলে তাদের নিরপেক্ষ তদারকি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রাস্টির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টিদের প্রধান দায়িত্ব হলো ফান্ডের সম্পদ সুরক্ষা, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের কার্যক্রম তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। সেখানে ট্রাস্টিরা যদি নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে তা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং পুরো তদারকি কাঠামোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
ট্রাস্টি ফি ছাড়াও সম্মানি গ্রহণ সংক্রান্ত এই তদন্তের মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক তথ্য না পেলে কমিশনকে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে-বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ট্রাস্টি ও সম্পদ ব্যবস্থাপকের মধ্যে আর্থিক লেনদেন থাকলে তা মিউচুয়াল ফান্ড খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দেয়, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর।
বিএসইসির চিঠিতে যা বলা হয়েছে
সম্প্রতি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের একজন বিনিয়োগকারী কমিশনের কাছে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি সংক্রান্ত কয়েকটি অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগসমূহে, অন্যান্য বিষয় ছাড়াও ট্রাস্টি তাদের ট্রাস্টিশিপের অধীনে থাকা প্রতিটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড থেকে নির্ধারিত ট্রাস্টি ফি গ্রহণ করার পাশাপাশি ট্রাস্টি কমিটির সদস্যরা ত্রৈমাসিক সভায় অংশগ্রহণের জন্য সম্মানি বাবদ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন।
এমতাবস্থায়, উত্থাপিত অভিযোগসমূহের গ্রহণযোগ্যতা ও সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে, আপনার ব্যবস্থাপনাধীনে থাকা কোনো মিউচ্যুয়াল ফান্ডের তহবিল কিংবা সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ট্রাস্টি কমিটির সদস্যদের সভাভিত্তিক সম্মানি বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে কিনা-এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক, সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য কমিশনে দাখিল করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৮২(১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে উপযুক্ত তথ্য পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো- বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
নতুন বিধিমালা কঠোর হওয়ার তাগিদ
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে গত বছরের নভেম্বরে বিএসইসি নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা জারি করে। ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী মিউচুয়াল ফান্ড খাতে নজরদারি ও জবাবদিহিতা আরো জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইনভেস্টইট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমরান হাসান বলেন, “ট্রাস্টি সদস্যেদের জন্য আইন অনুযায়ী একটি কমিশন নির্ধারণ করা আছে। তাই তাদের আলাদা ফি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর বাইরে যদি কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ট্রাস্টি কমিটির সদস্যেদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে, তবে সেটা ঠিক নয়।”
তিনি আরো বলেন, “ট্রাস্টি মিউচুয়াল ফান্ডের স্বচ্ছতা ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন হয় তবে সেটা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বা অনৈতিক বলেই বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে এই বিষয়টি অবশ্যই নজরে এনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ঢাকা/এনটি/এসবি