আলোচিত গ্রিনল্যান্ডের অজানা তথ্য
ফটো ফিচার ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী এক মন্তব্যে নড়েচড়ে বসেছে গোটা ইউরোপ। বরফে আচ্ছাদিত বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপে এখন বিশ্ববাসীর চোখ আটকে আছে। এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নানা সমীকরণের হিসাব-নিকাশ চলছে। গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাড়ে ৪ হাজার বছরের প্রাচীন মানব ইতিহাস। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরেও দ্বীপটি নিয়ে অনেক বিস্ময়কর তথ্য রয়েছে। চলুন, ছবি দেখতে দেখতে সেসব জেনে নিই—
আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ—গ্রিনল্যান্ড, এটি কোনো মহাদেশ নয়। গ্রিনল্যান্ডের মোট আয়তন প্রায় ২১.৬ লাখ বর্গকিলোমিটার। মোট আয়তনের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি বরফের চাদরে ঢাকা। যদিও বরফমুক্ত এলাকা তুলনামূলকভাবে কম, তবু সেটুকুর আয়তন সুইডেনের (৪ লাখ ৫০ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার) সমান। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, গ্রীনল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা ৫৬ হাজার ৪৮০ জন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।
‘গ্রিনল্যান্ড’ শব্দটিকে দুটো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন—‘গ্রিন (সবুজ)+ল্যান্ড (ভূমি)’। যার বাংলা তরজমা—‘সবুজভূমি’। অথচ বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড বরফ, তুষার আর হিমবাহে ঢাকা। অর্থাৎ প্রায় পুরোপুরি সাদা। তাহলে ‘গ্রীনল্যান্ড’ নাম কীভাবে হলো? মূলত, এই নাম দিয়েছিলেন—এরিক দ্য রেড। এই আইসল্যান্ডিক হত্যাকারীকে দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়েছিল। নতুন বসতি স্থাপনকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য এই নাম দেন এরিক। বিজ্ঞানীদের মতে, ২৫ লাখ বছর আগে গ্রিনল্যান্ড সত্যিই সবুজ ছিল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাচীন মাটি ২ মাইল পুরু বরফের নিচে লাখ লাখ বছর ধরে জমাট অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালে গ্রিনল্যান্ডে প্রথম মানুষ পা রাখে। পরবর্তীতে সেই জনগোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়ে যায়। উত্তর আমেরিকা থেকে আসা অন্যান্য জনগোষ্ঠী সেখানে বসতি স্থাপন করে। দশম শতকের শুরুতে নর্স জাতিগোষ্ঠী আইসল্যান্ড থেকে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে বসতি গড়ে তোলে। তবে ১৫০০ শতকের শেষ দিকে তারাও হারিয়ে যায়। ১৩০০ শতকে এশিয়া থেকে গ্রীনল্যান্ডে যায় ইনুইটরা; এখনো তাদের বংশধররাই সেখানে টিকে আছে। ৪ হাজার ৫০০ বছর ধরে গ্রিনল্যান্ডে মানুষ বসবাস করে আসছে।
গ্রিনল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষ ‘গ্রিনল্যান্ডিক’ (কালালিসুট) এবং ডেনিশ ভাষায় কথা বলেন। ১৯৭৯ সাল থেকে এই দুই ভাষা সরকারি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে স্কুলে শিশুদের ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডিকের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাও শেখানো হয়। গ্রিনল্যান্ডিক ভাষা খুবই মজার, যার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এটি কানাডার ইনুইট ভাষাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
গ্রিনল্যান্ডের মোট আয়তন প্রায় ২১.৬ লাখ বর্গকিলোমিটার হলেও এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার জন্য কোনো রাস্তা বা রেলপথ নেই। শহরের ভেতরে রাস্তা আছে। কিন্তু শহরের বাইরে গিয়ে সেগুলো শেষ হয়ে গিয়েছে। এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতে হয় বিমান, নৌকা, হেলিকপ্টার, স্নোমোবাইল বা ডগস্লেড (বরফের ওপর দিয়ে চলা এক ধরনের বাহন, যা কুকুর টেনে থাকে)। গ্রীষ্মকালে গ্রীনল্যান্ডে নৌকা চলাচল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
মাছ ধরা গ্রিনল্যান্ডের অন্যতম প্রধান শিল্প। মাছ, সি ফুড, স্থানীয়ভাবে শিকার করা তিমি ও সিল ছাড়া প্রায় সবকিছুই আমদানি করতে হয় দেশটিতে। তবে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা থাকে, যাতে কেউ অতিরিক্ত শিকার করতে না পারে। নীল তিমির মতো কিছু প্রজাতি সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। তিমি ও সিলের মাংস রপ্তানি নিষিদ্ধ, এসব কেবল স্থানীয়রা খেতে পারেন।
গ্রিনল্যান্ডের এক-চতুর্থাংশ মানুষ রাজধানী নুকে বসবাস করেন। শহরটি ছোট হলেও বেশ আধুনিক ও প্রাণবন্ত। এ শহরে রয়েছে—জাদুঘর, ক্যাফে ও ফ্যাশন বুটিক। জাতীয় জাদুঘর, কাটুয়াক কালচারাল হাউজ ও নুক আর্ট মিউজিয়াম দর্শনীয় স্থান। শহরটি বিশাল ফিয়র্ডের মুখে অবস্থিত, রয়েছে পাহাড়। ফলে প্রকৃতি ঘেরা শহরটি ভ্রমণে দারুণ আনন্দ এনে দেয়।
মধ্যরাতে আকাশে সূর্য দেখার দেশ গ্রিনল্যান্ড। প্রতি বছরের ২৫ মে থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে সূর্য অস্ত যায় না। দিনে কিংবা রাতে সূর্য দেখা যায়। একে বলা হয়—মিডনাইট সান (মধ্যরাতের সূর্য)। ২১ জুন বছরের দীর্ঘতম দিন। এদিন গ্রিনল্যান্ডে জাতীয়ভাবে ছুটি থাকে। এ সময় মানুষ প্রকৃতিতে বারবিকিউ করে আর রোদ উপভোগ করে।
আর্কটিক অঞ্চলের মতো কঠোর জলবায়ুতে বসবাসের জন্য কার্যকর একটি পোশাক তৈরি করা হয়েছে দেশটির নাগরিকদের জন্য। ড্যানিশ উপনিবেশকারীদের মাধ্যমে দ্বীপে আসা নানা উপকরণ দিয়ে খুবই নাটকীয়ভাবে সাজানো হয়েছে পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের জাতীয় পোশাক। এ পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন উপকরণ। এ তালিকায় রয়েছে—সিলের চামড়া, বিভিন্ন ধরনের সিল চামড়া, শিয়াল বা কুকুরের লোম, তুলা। তাছাড়া বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ‘উজ্জ্বল মুক্তা’ ব্যবহার করে দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এখনো গ্রিনল্যান্ডের নারীরা বিশেষ দিনে খুব সাধারণভাবে পোশাকটি পরিধান করে থাকেন। সাদা তুলা দিয়ে তৈরি আনোরাক (হুটযুক্ত জ্যাকেটের মতো) ও কালো রঙের ট্রাউজার পরেন পুরুষেরা। এ পোশাক নারী সঙ্গীদের তুলনায় বেশ ফিকে মনে হয়!
ঔপনিবেশিক যুগ থেকে গ্রিনল্যান্ডের বাড়িগুলো ছোট আকারের ও উজ্জ্বল রঙে রাঙানো হয়ে থাকে; যাতে সেগুলো আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। ঐতিহাসিকভাবে, প্রতিটি রঙের একটি নির্দিষ্ট অর্থ ছিল; যা ভবনটিতে এর ব্যবহার বা উদ্দেশ্য নির্দেশ করত। তবে বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ তাদের ইচ্ছামতো যেকোনো রং বাড়িতে ব্যবহার করতে পারেন।
*সিক্রেট অ্যাটলাস, ভিজিট গ্রিনল্যান্ড অবলম্বনে
ঢাকা/শান্ত