ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কতটুকু এগিয়ে বাংলাদেশ  

সাগর সিদ্দিকী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪৫, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১২:৪৬, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কতটুকু এগিয়ে বাংলাদেশ  

২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনকালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হওয়ার তকমা লাগিয়েছে। 

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নীত হবে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। সর্বোপরি এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবার মাধ্যমে ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্নও দেখছে আমার দেশ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ এ মাথাপিছু আয় হবে ৫৪৭৯ ডলারের বেশি। ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। বিনিয়োগের হার জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০৪১ এই ২০ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ৯ শতাংশে ধরে রাখা এবং ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জনগুরুত্ব বিবেচনায় অন্যান্য প্রকল্প থেকে আলাদাভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে কিছু মেগাপ্রকল্প। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প,  চট্রগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও কক্সবাজার থেকে ঘুমঘুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে। স্বপ্নের এই প্রকল্পগুলো এগিয়ে যাচ্ছে অদম্যগতিতে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু ও রেল সংযোগ প্রকল্প

এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চমাঞ্চলের দূরত্ব ও সময় কমবে। ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ’ প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে মাওয়া থেকে জাজিরা, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন হয়ে ভাঙ্গা স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জিডিপি আনুমানিক ১.২ শতাংশ বাড়বে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিতব্য এই সেতুটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বেশ বড়সড় ভুমিকা রাখতে যাচ্ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ তিন কোটি মানুষ সরাসরি এর দ্বারা উপকৃত হবে। প্রতিবছর ১.৯ শতাংশ হারে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। নির্মিত হওয়ার ৩১ বছরের মধ্যে জিডিপি ৬০০০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে। প্রায় ১৫৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ৯ হাজার হেক্টর জমি ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পাবে। সেতুটি এশিয়ান হাইওয়ে ও ইউরেশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সিস্টেমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। ২০২১ সালের জুনে সেতুর কাজ সমাপ্তির কথা রয়েছে।

মেট্রোরেল

প্রকল্পটি ঢাকাবাসীর যানজট নিরসনে জাদুর কাঠির মতো কাজ করবে। ২০.১ কিমি লাইনে স্টেশন থাকবে ১৬ টি। প্রতি চার মিনিট পরপর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল। প্রতি ঘণ্টায় যাত্রী পরিবহন করতে পারবে প্রায় ৬০ হাজার। এই ২০ কিমি পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট। রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এই এমআরটি-৬ লাইনটির নির্মাণকাজ চলছে। ২০২১ সাল নাগাদ এর কাজ সমাপ্ত হবে।

তাছাড়া মেট্রোরেল প্রকল্পের আওতায় আরো দুটি লাইনের কাজ ফার্স্ট ট্রাক প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমআরটি লাইন ১ এর আওতায় এয়ারপোর্ট থেকে কমলাপুর আর নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মোট ২৭.৫কিমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পটির সময়সীমা ঠিক করা হয়েছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এমআরটি লাইন- ৫ এর আওতায় হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিমি পর্যন্ত হবে। এর ১৪ কিমি হবে পাতাল রুট আর বাকি ৬ কিমি হবে আ্যলিভেটেড রুট।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্প

রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্রগ্রামের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চট্রগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০.৮৩ কিমি ও কক্সবাজার থেকে মিয়ানমারের সীমান্তের ধুমধুম পর্যন্ত আরো ২৮.৭৫ কিমি রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২২ সালের শেষ নাগাদ রেল চলাচলের কথা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে নতুন দিগন্ত সূচিত হবে। ঝিনুক আকৃতির রেলস্টেশন নির্মিত হচ্ছে কক্সবাজার সদরেই। এটি ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত করবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

দেশের একক বৃহত্তর প্রকল্প এটি। উন্নয়ন অগ্রগতির মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে এই প্রকল্প। ২০২৩ সাল থেকে উৎপাদন কেন্দ্রটি ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এই কেন্দ্র হতে ৬০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের ৬ কোটি মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করবে।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প

বাগেরহাট জেলার রামপালে এই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬ শতাধিক মানুষ সরাসরি এবং ১০-১৫ হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে যুক্ত হবে এই প্রকল্পে। ২০২১ এর শেষে এই প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আসতে শুরু করবে।

মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প

২০২৩ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় প্রকল্পটি চলমান। এটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার 'আলট্রা সুপার ক্রিটিকাল প্রযুক্তির' কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি উৎপাদনে গেলে দেশের ১১ শতাংশ জনগোষ্ঠী নতুনভাবে বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে। সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। সোনাদিয়ার পরিবর্তে মাতারবাড়ীতেই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। চট্রগ্রাম সমুদ্র বন্দরের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিকল্পিত এই বন্দরের ক্ষেত্রে এগুলো কাটিয়ে ওঠা যাবে। সমুদ্র বন্দরটি নির্মিত হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প

আপাতত এ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এখান থেকে আগামী ১৫ বছর প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে।

পায়রা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কয়লাভিত্তিক পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ম ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কাজ সমাপ্ত হলে দেশের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।

পায়রা সমুদ্র বন্দর

২০২৩ সালের মধ্যেই ১৬ মিটার গভীরতার চ্যানেল ড্রেজিং সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসাবে গড়ে তোলা যাবে। পটুয়াখালী কলাপাড়ার এই সমুদ্র বন্দর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইপিজেড, এসইজেড, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতি খাতে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থান হবে। পুরো বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে নতুন এক রোমাঞ্চকর অগ্রযাত্রার সারথী হবে সাধারণ মানুষ।

এসব প্রকল্পছাড়াও কর্ণফুলীর বঙ্গবন্ধু টানেল একটি গর্ব করার মতো প্রকল্প। দেশের ইতিহাসে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশই প্রথম নদীর নিচ দিয়ে সোয়া তিন কিমি দৈর্ঘের টানেল নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পরই এটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এটি চট্রগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪০কিমি কমিয়ে দিবে। এর মধ্য দিয়েই এশিয়ান হাইওয়ে ও নতুন সিল্ক রুটে প্রবেশ করবে বন্দরনগরী চট্রগ্রাম। ফলে কর্নফুলীর দুই তীর ঘিরে হবে নতুন বিনিয়োগ। তৈরি হবে শিল্পাঞ্চল। টানেল চালু হওয়ার ১ম বছরেই ৬৩ লাখ গাড়ি টানেলের নিচ দিয়ে চলাচল করবে। কর্ণফুলীর ওপার থেকে একজন মাত্র ১০ মিনিটেই চট্রগ্রাম বিমানবন্দর অথবা চট্রগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারবে।

এসব প্রকল্পের বাইরেও ২০৩০ সালের মধ্যে একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত নতুনভাবে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। রপ্তানি আয় ৪০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

জাবি/মাহফুজ/মাহি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়